২০, এপ্রিল, ২০১৯, শনিবার | | ১৪ শা'বান ১৪৪০

১২ সন্তানকে নির্যাতনের দায়ে বাবা-মায়ের ২৫ বছর জেল

বছরের পর বছর সন্তানদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বাবা-মাকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তাদের মোট ১৪টি অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) এক রায়ে বিচারক বার্নার্ড সেকওয়ার্টজ এই যুগলকে ‘স্বার্থপর ও নিষ্ঠুর’ পিতামাতা হিসেবে উল্লেখ করেন। লোমহর্ষক এই ঘটনা লস-অ্যাঞ্জেলসের। ডেভিড তারপিন (৫৭) ও লুইস তারপিনের (৫০) মধ্যবিত্ত পরিবারে রয়েছে ১৩ সন্তান। তাদের ছেলেমেয়েদের বয়স ২ থেকে ২৯ বছর। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে, তাদের ১৭ বছর বয়সী এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি সহায়তা নম্বর ৯১১-এ ফোন করে। মেয়েটি জানায়, সে জানালা দিয়ে পালিয়ে এসেছে, বাসায় তার ভাই-বোনদের নির্যাতন করছে বাবা-মা। তাদের বন্দি করে রাখা হয়েছে। পুলিশ পরবর্তী অনুসন্ধান চালিয়ে বাসাটি আবিষ্কার করে এবং রীতিমত আঁতকে ওঠে সবকিছু দেখে। বাহির থেকে পরিচ্ছন্ন মনে হলেও পুরো বাড়িটি ভিতরে ছিলো নোংরা ও মানব বর্জ্যের দুর্গন্ধ। সন্তানদের কারো পায়ে শিকল পরানো। তারা সবাই ছিলো অসুস্থ। পুলিশ সন্তানদের হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং তারপিন যুগলকে আটক করে। সন্তানদের অভিযোগ: সন্তান ও বাবা-মাকে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, ছেলেমেয়েদের দাঁত ব্রাশ করতে দেওয়া হতো না। দীর্ঘ এক বছর ধরে তারা গোসল করার অনুমিত পাচ্ছে না। তাদের নিয়ে যাওয়া হয়না ডাক্তারের কাছে। দিনে মাত্র একবেলা খাবার দেওয়া হয়। রাতে জেগে থাকতে ও দিনে ঘুমাতে বলা হতো। কথা না শুনলে তাদের শিকল পরিয়ে রাখা হতো ও প্রহার করা হতো। স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা নেই তাদের। সবচেয়ে বড় সন্তানটি মাত্র তৃতীয় গ্রেড পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল। তবে তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। সন্তানরা আরও অভিযোগ করেন, তাদের পাড়া-প্রতিবেশীদের কারো সঙ্গে মিশতে দেওয়া হতো না। তবে তারা ভালো আছে এমনটা বুঝাতে, কখনো কখনো ঘুরতে ডিজনিল্যান্ড ও অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হতো। পরানো হতো বাহারি পোশাক। কেন এমন করতেন পিতা-মাতা? তারপিন যুগল পুরো বিষয়টিকে ‘হোমস্কুলিং’ বা গৃহশিক্ষা হিসিবে অভিহিত করেছে। তাদের এক মেয়ের অভিযোগ, সাবেক লকহিড মার্টিন ইঞ্জিনিয়ার বাবা ডেভিড তারপিন এসব বিষয়ে প্রথমে তাদের মাকে প্রভাবিত করেন। মেয়েটি বলেন, আমি দেখলাম কি করে বাবা আমার মাকে আয়ত্তে নিতে শুরু করলো। এবং এক সময় তা আমাকেও বশ করতে শুরু করলো। তবে সত্যিই বুঝতে ভয়াবহ কি হচ্ছে। ডেভিড নিজের জবানবন্দিতে বলেছেন, সন্তানদের ক্ষতি করা তার ইচ্ছায় ছিলো না। তিনি শুধু তাদের নিরাপত্তা দিতে চেয়েছিলেন। এখন কেমন আছেন তারপিন যুগলের সন্তানরা? পুলিশ উদ্ধার করার পর ১৩ সন্তানের সবাই পুলিশের হেফাজতে আছে। তারা স্কুলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পরিবার তাদের দায়িত্ব নিতে আগ্রহ জানিয়েছে। তারা মুক্ত ও স্বাধীন হতে পেরে আনন্দিত বলেও জানায়। একইসঙ্গে বাবা-মায়ের ওপর তাদের রাগ-ঘৃণা-সহানুভূতি জানিয়েছে কেউ কেউ। সন্তানদের একজন ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, বাবা-মা পুরো জীবনটা আমার কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু এখন আমি পুনরায় জীবন পেয়েছি। জীবনের যে অংশটা আমার জন্য কঠিন ছিল তা আমাকে দৃঢ় করেছে। আমি এখন রকেটের মতোই উড়ছি। আরেকজন জানায়, সে বাইক চালানো শিখেছে। পড়াশোনা করে সে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় এবং মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করার ইচ্ছা তার। বাবা-মায়ের জন্য তার মায়া হয় এবং তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা করে দিয়েছে বলেও উল্লেখ করে সে। সে বলে, আমি সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারবো না। আমাদের সঙ্গে যা ঘটেছে তা আমার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো লাগে। ভাই-বোনদের শিকড় পরিয়ে প্রহার করা হতো। কিন্তু সেসব অতীত। এখন এটাই বর্তমান। কিছু ছেলেমেয়ে আবার বাবা-মায়ের শাস্তি কমিয়ে আনার জন্যও আবেদন জানিয়েছে আদালতের কাছে এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার আগ্রহ জানিয়েছে। তবে আদালত এই শাস্তির ব্যাপারে এতটাই কঠোর ছিলেন যে, তিনি এই ঘটনাকে ‘নরকে গৃহবন্দি’ করে রাখার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ভুল শিকার না করলে শিশুদের বাবা-মাকে আরও কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো বলেও মন্তব্য আদালতের।