১৬, জুন, ২০১৯, রোববার | | ১২ শাওয়াল ১৪৪০

ঈদ সামনে রেখে জমে উঠেছে রাজধানীর ফুটপাতের বাজার

আপডেট: মে ২৭, ২০১৯

ঈদ সামনে রেখে জমে উঠেছে রাজধানীর ফুটপাতের বাজার

ঈদ সামনে রেখে জমে উঠেছে রাজধানীর ফুটপাতের বাজার। প্রচণ্ড গরমেও ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে ‘বাইচ্ছালন, দেইক্কালন’, ‘একশ’ ‘তিরিশ’ নানান কথায় পোশাক বিক্রেতারা অনর্গল ডেকে চলেছেন। ক্রেতা আর বিক্রেতার ভিড়ে জমজমাট ঢাকার ফুটপাতগুলো। ঈদুল ফিতরের এখনো প্রায় ১০ দিন বাকি থাকতেই পছন্দের পোশাক কিনতে নিজেদের একমাত্র ভরসা ফুটপাতের অস্থায়ী বাজারে ছুটে যাচ্ছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। সাধ ও সাধ্যের মিশেলে রাঙিয়ে তুলতে চেষ্টা করছেন আসন্ন ঈদ। আর এ নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে বসা দোকাগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত লেগে থাকছে ভিড়। রোদে পুড়ে, গরমে ঘেমেও থেমে নেই মানুষের ঈদের কেনাকাটা। শুধু নিম্ন আয়ের মানুষেরাই নন, বিত্তবানরাও নিজেদের অনেক দরকারি সংগ্রহের জন্য বেছে নিচ্ছেন ফুটপাতের এই বাজার। দোকানদারদের দাবি, ফুটপাতে পোশাকের দাম কম হলেও এগুলোর মান খারাপ তা নয়; বরং দোকান ভাড়া লাগে না বা কম লাগে বলেই অভিজাত দোকানে বিক্রি হওয়া পোশাকগুলোর সমমানের পণ্য কমমূল্যে ফুটপাতে পাওয়া যায় বলে তাঁদের দাবি।

রোববার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভাসমান এসব দোকানের মালিকরা কেউ দড়ির ওপর, কেউ বা প্লাস্টিকের হ্যাঙ্গারে, আবার কেউ চৌকিতে বাহারি রং আর ডিজাইনের পোশাক সাজিয়ে রেখেছেন। সাইজ ও কোয়ালিটিভেদে এসব দোকানে  শিশুদের পোশাক মিলছে ৩০ থেকে ৩০০ টাকায়। আবার অনেকে ১৫০ টাকার প্যাকেজেও বিক্রি করছেন বাচ্চাদের পোশাক। অন্যদিকে পুরুষদের জন্য রয়েছে স্বল্পমূল্যে শার্ট, প্যান্ট, পাজামা-পাঞ্জাবি, টুপি, টি-শার্টসহ নানা জিনিস। এ ছাড়া মেয়েদের জন্য আছে ফ্রক, লেহেঙ্গা, ডিভাইডার, টপস থেকে শুরু করে হালফ্যাশনের  জুতা, সালোয়ার-কামিজ, কসমেটিকসসহ দরকারি সবকিছুই।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, জিরোপয়েন্ট, গোলাপশাহ মাজার মোড়, বায়তুল মোকাররম, মতিঝিল, নিউমার্কেট, ফার্মগেট, মালিবাগ, শান্তিনগরসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতগুলো ক্রেতাদের ভিড়ে এখন মিনি ঈদ মার্কেটে রূপ নিয়েছে। স্বল্প আয়ের মানুষ ঘুরে ঘুরে যাচাই-বাছাই করে প্রিয়জনের জন্য কিনছেন পছন্দের পোশাক। একেবারে শেষ মুহূর্তের ঝক্কিঝামেলা এড়াতেই এত ভিড় এসব ফুটপাতে। গাউছিয়া ও নিউমার্কেটের ফুটপাত ঘুরে দেখা যায়, এগুলোতে বসেছে জিন্স প্যান্ট, টি-শার্ট, মেয়েদের পাজামা, স্যান্ডেলসহ প্রয়োজনীয় নানান পোশাকের বিশাল বাজার। সব বয়সের মেয়েদের কাছে ফুটপাতের এসব বাজারের স্যান্ডেলের ব্যাপক চাহিদা। বাহারি হরেক রকমের স্যান্ডেল এগুলোতে পাওয়া যায় ১৫০ থেকে ৬০০ টাকা মূল্যে। তবে সুযোগ বুঝে কিছু দোকানি দাম বেশি রাখছেন বলেও অভিযোগ অনেক ক্রেতার। এদিকে ঈদের আগে আগে ক্রেতাদের ভিড়ে খুশি দোকানদাররা। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ফুটপাতে বসা আবুল কালাম নামের এক জুতার দোকানদার জানান, ঈদের দিন যতই ঘনিয়ে আসবে, তাঁদের বেচা-বিক্রিও ততই বাড়তে থাকবে। চাঁদরাত পর্যন্ত চলবে এ ব্যস্ততা।’

ফুটপাতের পোশাকের দাম ও মান প্রসঙ্গে নুসরাত জাহান নামের কেনাকাটা করতে আসা এক নারী বলেন, ‘এসব জায়গায় শিশুদের পোশাকের কালেকশন ভালো। তবে অন্যবারের চেয়ে এবার দাম একটু বেশি। আরেক ক্রেতা সায়লা আক্তার বলেন, ‘অন্য বছর ছেলেদের যে পোশাক দুইশ থেকে আড়াইশ টাকায় কিনেছিলাম, এবার তার দাম চাওয়া হচ্ছে চারশ থেকে ছয়শ টাকা। তিন জোড়া জামা কিনতে এলেও দাম বেশি হওয়ায় দুই জোড়া নিয়েছি।’ নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাতে ঈদবাজার করতে আসা পোশাক শ্রমিক শায়লা খাতুন বলেন, ‘আমাগো তৌফিক যা আছে হেইয়া দিয়াই পোলা-মাইয়াগো মুহের হাসি দ্যাখতে চাই।’ মেয়ের জন্য তিনশ টাকায় একটা জামা ও ছেলের জন্য দেড়শ টাকায় একটা শার্ট কিনেছেন বলে জানান শায়লা। আরো একজোড়া জুতা কেনার উদ্দেশ্যে ঘুরছেন তিনি। তবে হাতে টাকা কম থাকায় অনেক দোকান ঘুরে দেখতে হচ্ছে। ফুটপাতগুলো ঘুরে দেখা যায়, এগুলোতে ছেলেদের শার্ট সাধারণত বিক্রি হচ্ছে দেড়শ থেকে পাঁচশ টাকার মধ্যে, জিন্স প্যান্ট দুইশ থেকে সাতশ, টি-শার্ট ১২০ থেকে আড়াইশ, থ্রিপিস তিনশ থেকে সাড়ে ছয়শ, বাচ্চদের থ্রি-কোয়ার্টার জিন্স প্যান্ট দেড়শ থেকে আড়াইশ, গেঞ্জি সেট ১২০ থেকে দুইশ, ফ্রক ও টপস ২২০ থেকে সাড়ে চারশ ও বাচ্চাদের ওয়ান পিস ৩০ থেকে ১২০ টারকার মধ্যে।

মতিঝিল ও গুলিস্তানের  ফুটপাতে ছেলেদের শার্ট, গেঞ্জি, টি-শার্ট, প্যান্টের ভালো মানের কাপড় পাওয়া যায় বলে অভিমত অনেকের। তবে বিশেষ করে গুলিস্তানে ছেলেদের জুতা, স্যান্ডেল ও চামড়ার বেল্টের চাহিদা বেশি। এ ছাড়া এসব ফুটপাতে তরুণদের জন্য হরেক চেক ও ডিজাইনের শার্ট পাওয়া যায়। জায়গাভেদে এসব শার্টের দাম পড়বে দুইশ থেকে সাড়ে পাঁচশ টাকা। টি-শার্টের দাম পড়বে তিরিশ থেকে শুরু করে চারশ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে জিন্স প্যান্টের দাম দুইশ থেকে আটশ টাকার ভেতর। এ এলাকায় কেনাকাটা করতে আসা ফরহাদ হোসেন নামের এক ক্রেতা জানান, ঢাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দোকানে চাকরি করেন তিনি। এরই মধ্যে ঈদের বোনাস পেয়েছেন। চাঁদরাতে গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী যাওয়ার আগে বাবা ও ভাইদের জন্য শার্ট ও গেঞ্জি কিনতে এসেছেন।

ফরহাদ ফুটপাতের দোকানে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন পোশাকের মান নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, ‘ফুটপাত বলে এখানে নিম্নমানের পণ্য পাওয়া যায়, তা ঠিক না। এখানে গার্মেন্টসের পণ্যই বেশি।’ সব মিলিয়ে প্রতিদিন ক্রেতা-বিক্রেতার এক চলমান আনন্দযজ্ঞে পরিণত হয়ে উঠেছে রাজধানীর ফুটপাতের দোকানগুলো। এসব দোকানই দিয়ে চলেছে নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে নিম্ন মধ্যবিত্ত, এমনকি অনেক মধ্যবিত্তের মানুষের চাহিদা আর সাধ্য অনুযায়ী পোশাকের যোগান। আগামী দিনগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় আরো বাড়বে বলে আশাবাদ দোকানিদের।    তবে ফুটপাতে বসতে বিভিন্ন সমস্যার কথাও তুলে ধরেন অনেক দোকানি। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ফুটপাতে দোকান সাজিয়ে বসা মুনির হোসেন নামের এক ক্রেতা এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘সারা বছর পুলিশের কারণে বসতে সমস্যা হয়। আমরা গরিব মানুষ পুরা রোজার মাসে তেমন বসতে পারি নাই। এখন ঈদের সময়ও যদি বসতে না পারি, তাইলে পালোপাইন নিয়া খামু কী? কয়েকদিন আগেও বেচা-বিক্রি ছিল কম। এখন কিছুটা বাড়ছে।’