১৭, জুন, ২০১৯, সোমবার | | ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

নব আনন্দে জাগো

আপডেট: এপ্রিল ১৪, ২০১৯

নব আনন্দে জাগো

আজ পহেলা বৈশাখ ১৪২৬। পুরনো বছরের সব জীর্ণ-পুরাতন স্মৃতি, অশ্রুবাষ্পকে সুদূরে মিলিয়ে দিতে এসেছে নতুন বছর। চৈত্রসংক্রান্তি আয়োজনের মধ্য দিয়ে গতকাল ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানানো হয়েছে। আজ নতুন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের নতুন হালখাতা খুলবে বাঙালি। ধর্মান্ধতা, উগ্রতার বিপরীতে উদারনৈতিক ও বিশ্বভাবনা সমৃদ্ধ চেতনার আকাক্সক্ষায় জাতীয় ঐক্য ও সংহতি, অখণ্ড বিশ্বমানবের অংশীদার হওয়ার বাসনা এবং সব মানুষের মঙ্গল কামনায় বাঙালি আজ মেতে উঠবে বর্ষবরণে। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে বাংলাদেশ যখন ১৪২৬-কে বরণ করে নিতে যাচ্ছে তখন বৈশাখের চিরায়ত অসাম্প্রদায়িকতা ও সার্বজনীনতার অমোঘ মন্ত্র কতটা সর্বজনীন হয়ে উঠেছে- সে প্রশ্ন উঠেছে বারবার।

প্রশ্ন উঠেছে-সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, জাতিভেদ, শ্রেণিবৈষম্য, শোষণ, নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা, সামাজিক নিপীড়ন ও বিভেদ এখনো কেন জেঁকে বসে আছে? বাঙালির আত্মপরিচয়ের অতুল উৎসব পহেলা বৈশাখকে নিয়ে এখনো কেন বিষোদ্গার করে চলেছে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী? বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা বর্ষবরণ অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ উদযাপনের রীতি পাকিস্তান আমল থেকেই নানা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে। শত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বাঙালি তার আত্মপরিচয় প্রকাশের প্রধান উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে পহেলা বৈশাখকে। বাংলা নববর্ষ উদযাপন আবাহন বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই অংশ। সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ও ঐক্য সুসংহত করতে ১৯৫১ সালে প্রথম ‘শুভ নববর্ষ’ জানিয়ে নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিল তৎকালীন ‘লেখক শিল্পী মজলিস’।

এরই পরম্পরায় ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে শুরু হয় বর্ষবরণের সব থেকে বড় আনুষ্ঠানিকতা। বৈশাখের প্রথম প্রভাতে গানে গানে নতুন বছরকে আবাহনের মধ্য দিয়ে আপামর বাঙালির মধ্যে সর্বজনীন বৈশাখী আবেগ তৈরি করতে সমর্থ হয় ছায়ানট। ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বৈশাখী উৎসবের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে পরবর্তীতে যুক্ত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। লোক-বাঙলার হাজার বছরের এতিহ্যম-িত নানা বিষয়ানুষঙ্গের প্রতীকী উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে একেক বছর একেক থিম নিয়ে আসে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বিশ্ব ও মানবের মঙ্গলার্থী শোভাযাত্রাও ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। ২০১৬ সালেই জাতিসংঘের ইউনেস্কো চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতি ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে।

পহেলা বৈশাখের মতো এশিয়ার সর্ববৃহৎ এ অসাম্প্রদায়িক উৎসবের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ফতোয়া, বিষোদ্গার, কুৎসা রটনা বেড়ে চলেছে। বৈশাখের এ উৎসবকে স্তব্ধ করে দিতে ২০০১ রমনার বটমূলে সংঘটিত হয় ভয়াবহতম বোমা হামলা। হত্যা করা হয় সংস্কৃতিপ্রিয় বাঙালিদের। ১৮ বছরেও সে হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়নি। জাতীয় এ উৎসবকে বিতর্কিত করার সাম্প্রদায়িক তৎপরতা যেমন থেমে নেই। অথচ জাতিতে জাতিতে সহিষ্ণুতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উৎকর্ষ সাধন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বিলোপ, ধর্ম-জাতির সব ধরনের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বাঙালির চিরায়ত চেতনাকেই শাণিত করে এ উৎসব।

পহেলা বৈশাখে উৎসব ভাতা প্রদান, রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসব উদযাপনে প্রণোদনা দান এবং জাতীয় উৎসব হিসেবে ছুটি ঘোষণা করে রাষ্ট্র একদিকে এ উৎসবকে যেমন উৎসাহিত করছে তেমনি নিরাপত্তার অজুহাতে সময় সঙ্কোচনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আমেজ নষ্ট করে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে-এমন অভিযোগ প্রথিতযশা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের। তাদের মতে সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে এদেশের চিরায়ত সংস্কৃতির ওপর বর্বর আক্রমণ চালিয়ে আসছে।

মৌলবাদী অপশক্তির আক্রমণ ও রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে যাত্রাপালাসহ সংস্কৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরকার সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে দিন দিন আসকারা পাচ্ছে এ অশুভ শক্তি। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তির চাপে নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে সবাইকে ঘরে বন্দী করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিকাল ৫টার মধ্যে বর্ষবরণ উৎসবের ইতি টানার সরকারি নির্দেশনার পর এমন বিবৃতি দিয়েছেন ভাষাসংগ্রামী আহমেদ রফিক, কামাল লোহানী, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. সফিউদ্দিন আহমদ, নাট্যকার মামুনুর রশীদ, সাংবাদিক আবুল মোমেন, চলচ্চিত্রকার মশিহউদ্দিন শাকেরসহ বিশিষ্টজনরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাঙালির আবহমান সংস্কৃতিতে মধ্যে জাত-ধর্ম-বর্ণের বিভেদ নেই। সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র নির্মাণ করেছে এ দেশের মানুষ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সে চেতনার বাস্তবায়ন আজও অধরা। মানুষের মানুষে সম্প্রীতি, পরমত সহিষ্ণুতা, সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়েছে। ৭৫-এর বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী পাকিস্তানপন্থি শক্তিকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। নানা সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে সে শক্তি আজ দানবে পরিণত হচ্ছে।

এ দেশের বহুধারার শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিভেদের ঘৃণ্য মানসিকতায় বেড়ে উঠেছে নতুন প্রজন্ম। এর ফলে পহেলা বৈশাখের মৌলচেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার পরিপন্থী জনগোষ্ঠী তৈরির অপচেষ্টা বিস্তৃত হচ্ছে। এবারের পহেলা বৈশাখের আগেও বর্ষবরণের এ উৎসবের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন ধর্ম ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। পাকিস্তানি শাসকদের মতো একে ‘হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি’ বলে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষও ছড়িয়েছেন তারা। রাষ্ট্রীয়ভাবে পহেলা বৈশাখে নিরাপত্তার চাদর তৈরি করলেও যেসব উৎসমূল থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো হয় সেসব জায়াগায় সরকার পদক্ষেপ নিতে গড়িমসি করছে বলেও অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পহেলা বৈশাখের মতো চিরশান্তি, মঙ্গল ও সর্বজনীন কল্যাণাকাক্সক্ষী উৎসবকে বিভেদের কালিমা থেকে রক্ষা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিদ্বজ্জন, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষাবিদ ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। সেই সঙ্গে বাঙালির একমাত্র সার্বজনীন এ উৎসব দেশের প্রতি প্রান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।