২০, মার্চ, ২০১৯, বুধবার | | ১৩ রজব ১৪৪০

পুলিশেও সফল নারী

আপডেট: মার্চ ৮, ২০১৯

পুলিশেও সফল নারী

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করে উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলছেন নারী পুলিশ সদস্যরা। ১৯৭৪ সালে মাত্র ১৪ জন কনস্টেবল দিয়ে পুলিশ বাহিনীতে শুরু হয় নারীর পথচলা। এখন পুলিশ বাহিনীতে নারীর সংখ্যা ১৩ হাজার ৩২৯ জন।

বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত নানা পর্যায়ে সফলতার সঙ্গে তারা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর। ওই পদে সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত আইজিপি রৌশন আরা। এরপরই পুলিশ বাহিনীতে আছেন চারজন অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার নারী পুলিশ সদস্য।

তাদের মধ্যে রওশন আরা বেগম ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট-সিআইডিতে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ-সিএমপিতে (অতিরিক্ত কমিশনার) আমেনা বেগম, স্পেশাল ব্রাঞ্চে (এসবি) এ রখফার সুলতানা ও র‌্যাব-৮ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) হিসেবে কাজ করছেন আতিকা ইসলাম।

এছাড়া পুলিশ সুপার পদে গাজীপুরে শামসুন্নাহার ও রাজবাড়ীতে আসমা সিদ্দিকা মিলি সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-এপিবিএন-১১ এর নেতৃত্বে আছেন শাহিনী আমীন। গত দুটি পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন নারী সার্জেন্ট পান্না। এর আগের দুই বছর পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন নারী পুলিশ কনস্টেবল মিতালী রানী বিশ্বাস।

সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দফতর থেকে শুরু করে পুলিশের সব ইউনিটেই এখন নারী সদস্যরা কাজ করছেন। কয়েকটি ইউনিটের নেতৃত্বেও আছেন নারী। সারা দেশের ৮টি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার এবং ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন পরিচালনা করছেন নারী সদস্যরাই।

এপিবিএনের একটি ইউনিট পুরোটাই পরিচালনা করছেন নারী সদস্যরা। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল টেকার হিসেবে এরই মধ্যে নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দিয়ে আলোচনায় ওঠে এসেছেন নারী সদস্যরা। পুলিশে সার্কেল এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অনেকে। অতীতে বেশ কয়েকটি থানায় ওসি হিসিবে দায়িত্ব পালন করেছেন মর্জিনা বেমগসহ একাধিক নারী।

এখন দিনাজপুরের কোতোয়ালিসহ একাধিক থানায় ওসি হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন শাকিলা পারভীনসহ একাধিক নারী পুলিশ সদস্য।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, একজন অতিরিক্ত আইজিপি এবং চারজন অতিরিক্ত ডিআইজি ছাড়াও পুলিশে ৭২ জন এসপি, ১০১ জন অতিরিক্ত এসপি, ৯৬ জন এএসপি, ১১২ জন পরিদর্শক, ৭৭৬ জন এসআই, ৫৫ জন সার্জেন্ট, ১ হাজার ২৬ জন এএসআই, ৯৩ জন নায়েক ও ১১ হাজার ২ জন নারী পুলিশ সদস্য কনস্টেবল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) প্রথম সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে যোগদান করেন ফাতেমা বেগম নামে একজন নারী। ফাতেমা বেগমের যোগদানের পরের ব্যাচে ১৯৮৮ সালে সপ্তম বিসিএসের মাধ্যমে যোগদান করেন ৪ জন নারী।

কিন্তু ১৯৮৯ সালে পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদে নারী পুলিশ অফিসারদের নিয়োগ দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। তাই অষ্টম বিসিএস থেকে ১৭তম বিসিএস পর্যন্ত কোনো নারীকে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ দেয়া হয়নি। ১৯৯৯ সালে ১৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ৮ জন নারী এএসপি পুলিশে যোগদানের মাধ্যমে ফের পুলিশ ক্যাডারে নারীদের প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত হয়।

২০০৯ সালে ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানায় দেশের প্রথম ওসি হিসেবে যোগদান করেন পুলিশ পরিদর্শক হোসনে আরা বেগম। ভাসানটেক থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি এএসপি হিসেবে পদোন্নতি পান। এখন তিনি অবসরে আছেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) প্রথম নারী ওসি হলেন মর্জিনা আক্তার। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন হাসিনা বেগম। নরসিংদীতে আমেনা বেগম (অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত), রাজবাড়ীতে সালমা বেগম এবং চাঁদপুরে সামসুন্নাহর এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৫ সালে ২৯ জন নারী সার্জেন্ট ঢাকাসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটনে কাজ শুরু করেন। এ সংখ্যা এখন ৫৫ জন। তাছাড়া ইমিগ্রেশন, এসবি এবং সিআইডিতে পুরুষদের সঙ্গে সমান দক্ষতায় কাজ করছেন নারী পুলিশ সদস্যরা। খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও পুলিশের নারী সদস্যরা সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। জাতিসংঘ পুলিশ এবং জাতিসংঘ জবে বাংলাদেশ নারী পুলিশের প্রতিনিধি আছেন। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশে (আইএডব্লিউপি) বাংলাদেশ নারী পুলিশের প্রতিনিধি আছেন। প্রতিবছরই এ সংগঠনের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বাংলাদেশের নারী পুলিশ অংশ নেন।

পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান বলেন, ১৯৮৮ সালের পর ১০ বছর বিসিএসের মাধ্যমে পুলিশে নারী সদস্য যোগদান বন্ধ থাকায় মাঝখানে মিড লেভেলে নারী পুলিশ সদস্যের শূন্যতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু ১৮তম বিসিএসের পর প্রত্যেক বিসিএসেই নারী পুলিশে যোগদান করছেন। নির্ধারিত কোটা মেনেই নারীকে নিয়োগ দেয়া হয়। ১০ ভাগ কোটার বাইরেও মেধার ভিত্তিতে নারী পুলিশে যোগ দেন। সম্প্রতি কোটাপ্রথা বাতিল হওয়ায় মেধার ভিত্তিতে পুলিশে নারী কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি ও বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে পরিচালক আবিদা সুলতানা বলেন, এ পেশা অন্যান্য পেশার চেয়ে ভিন্নতর। কাজের ধরনও ভিন্ন। যেসব নারী পুলিশে যোগদান করেন, তারা এই মানসিকতা নিয়েই আসেন যে, তাদের চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। আসার পর এসআই এবং এএসপিদের এক বছরের একটি প্রশিক্ষণ নিতে হয়, কনস্টেবলদের ছয় মাসের। এ ট্রেনিং পুরুষের মতোই।

পুলিশ কর্মকর্তা আবিদা সুলতানা বলেন, পেশাগত কাজে এখন নারীর তেমন সমস্যা হচ্ছে না। বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক নামে আমাদের একটি সংগঠন আছে। আমি এ সংগঠনের গত কমিটির সাধারণ সম্পদক ও বর্তমান সদস্য। এখানে আমাদের একটি হটলাইন নম্বর রয়েছে। যদি কোনো নারী সদস্য কর্মক্ষেত্রে হয়রানির সম্মুখীন হন, সঙ্গে সঙ্গে হটলাইনে ফোন করে জানান। এরপর যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়। সূত্র: যুগান্তর