২৩, জুলাই, ২০১৯, মঙ্গলবার | | ২০ জ্বিলকদ ১৪৪০

বরিশালে প্রায় দু’শ বছরের পুরনো কাশিপুর মুখার্জী বাড়ির পূজা

আপডেট: অক্টোবর ১৭, ২০১৮

বরিশালে প্রায় দু’শ বছরের পুরনো কাশিপুর মুখার্জী বাড়ির পূজা

নগরীতে এ বছর ৩৮টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা পালিত হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো পূজা হচ্ছে কাশিপুরের মুখার্জী বাড়ির মন্দিরে। ১৭০ বছর আগে এই মণ্ডপে পূজা শুরু হয় বলে মুখার্জী বাড়ির পূজারিরা জানান। ৭৫ বছর বয়সী কৃষ্ণা মুখার্জী জানান, তার ঠাকুরদা (দাদা শ্বশুর) স্বর্গীয় কৃষ্ণ লাল মুখার্জী ১৯৬১ সালে ১০৮ বছর বয়সে মারা যান। তিনি শিশু বয়সেই এই বাড়িতে পূজা হতে দেখেছেন। কৃষ্ণ লাল মুখার্জীর মুখ থেকেই তার নাতবউ কৃষ্ণা মুখার্জী এ বাড়ির পূজা নিয়ে নানান কথা শুনেছেন। রূপকথার গল্পের মতই স্মৃতিচারণ করে সেই সব দিনের কথা প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরলেন কৃষ্ণা মুখার্জী। যে দিন এ বাড়িতে নববধূ হয়ে এসেছিলেন সেদিনের পূজা আর এই বৃদ্ধ বয়সে পূজার মধ্যে তিনি তেমন কোনো পার্থক্য খুঁজে পান না। শুধু পার্থক্য বেড়েছে মানুষের মাঝে। আগে পূজাসহ নানান অনুষ্ঠানে মানুষের মাঝে যে আন্তরিকতা ছিল তার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয় এই বৃদ্ধ বয়সে। মানুষ যেন যান্ত্রিক হয়ে গেছে। মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের কথা যেন ভুলতে বসেছে নবযুগের নতুন বাসিন্দারা। পূজার অনুষ্ঠান ব্যতিত মানুষ আর তেমন একটা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যান না। বৃদ্ধ বয়সে তবুও বাড়িতে আগের মতই পূজার আয়োজন দেখে তিনি তৃপ্ত।

বাড়ির বর্তমান কর্ণধার জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মানিক মুখার্জী কুডু ও তার বড় ভাই জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুকুল চন্দ্র মুখার্জী ইত্তেফাককে জানান, তাদের পিতা জুরান মুখার্জীর মুখ থেকে শুনেছেন ঠাকুরদা কুঞ্জ বিহারী মুখার্জী ও কুঞ্জ বিহারীর পিতা চন্দ্রকান্ত মুখার্জী এখানে দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন। তখন শুধুমাত্র কাশিপুর এলাকায় ১শ’টি পূজামণ্ডপ ছিল। কালের বিবর্তনে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দেশ ত্যাগ করায় এখন কাশিপুরের হাতেগোনা দুই/একটি পূজা হলেও পুরনো কোনো পূজামণ্ডপ নেই। মানিক মুখার্জী জানান, প্রায় দু’শ বছর যাবত্ ব্যক্তি উদ্যোগে পারিবারিকভাবে এ পূজা উদযাপিত হয়ে আসছে। সরকারি কোনো অনুদান তারা নিতে চান না।

মুখার্জী বাড়িতে ৫০ বছর যাবত্ পূজা দিতে আসা পুরোহিত অসিত কুমার চ্যাটার্জী (৮৮) ইত্তেফাককে জানান, তার বাড়ি বাকেরগঞ্জের নন্দপাড়ায় হলেও স্বাধীনতার চার বছর পূর্ব থেকে মুখার্জী বাড়িতে পূজা দিতে আসেন। সেই থেকে প্রতি বছর দুর্গাপূজার জন্য তিনি ও তার স্ত্রী শোভারানী যুক্ত রয়েছেন। তিনি বলেন স্বর্গীয় জুরান মুখার্জীর হাত ধরে এসে ধর্মীয় আচার মেনেই তিনি এ দীর্ঘ অর্ধশত বছর পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করছেন।

বরিশালের প্রবীণ সাংবাদিক ও আইনজীবী মানবেন্দ্র বটব্যাল জানান, কাশিপুর মুখার্জী বাড়ির পূজাই হচ্ছে সবচেয়ে পুরনো পূজা মন্দির। তিনিও শিশুকাল থেকেই এখানে পূজা হতে দেখেছেন। এত প্রাচীন মন্দির আর বরিশালে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতায় যারা

এদিকে মহানগরীর ৩৮টি পূজামণ্ডপের মধ্যে এবার সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে ফলপট্টি পূজা মন্দির, কালিবাড়ী পূজা মন্দির, দপ্তরখানা পূজা মন্দির, ভাটিখানা সাহাপাড়া পূজা মন্দির, চার্জ ওয়ার্ড পূজা মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন ও শংকরমঠ পূজা মন্দির। প্রতি বছর পূজার ভ্যান ও শারদীয় মিলন মেলা উদযাপন পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান এখানকার সেরা পূজামণ্ডপকে পুরস্কার দিয়ে থাকে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ছাড়াও থাকে সান্ত্বনা পুরস্কারের ব্যবস্থা। প্রথম তিনটি স্থান ছিনিয়ে নিতে উল্লিখিত মণ্ডপের পূজারি ও পূজা কমিটির নেতৃবৃন্দ ঘুম হারাম করে মাঠে নেমেছেন। কে কার চেয়ে আকর্ষণীয় পূজা উপহার দিতে পারেন তা নিয়েই চলছে প্রতিযোগিতা। ফলপট্টি পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত দাস জানান, এবার তারা পূজায় নতুন সংযোজন করেছেন বাহুবলি তোরণ। এছাড়াও শংকর মঠ, ভাটিখানা মন্দির, নতুন বাজার মন্দিরসহ নগরীর মন্দিরগুলোকে ব্যতিক্রমী সাজে সাজানো হয়েছে।