২৩, মার্চ, ২০১৯, শনিবার | | ১৬ রজব ১৪৪০

বাংলাদেশকে এখন কেউ করুণার চোখে দেখে না: প্রধানমন্ত্রী

আপডেট: মার্চ ১৪, ২০১৯

বাংলাদেশকে এখন কেউ করুণার চোখে দেখে না: প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশকে এখন কেউ করুণার চোখে দেখে না; বাংলাদেশকে বিশ্ব এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবেই দ্যাখে। এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কুমুদিনী কমপ্লেক্সে রণদা প্রসাদ সাহা স্মারক স্বর্ণপদক প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কুমুদিনী ট্রাস্টের জন্য আমার দরজা সব সময় খোলা। এ ট্রাস্ট্রের মাধ্যমে অনেক কাজ হচ্ছে। জনগণের সেবায় সবসময় আমাদের সহযোগিতা থাকবে।’

তিনি কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বিডি) আয়োজিত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী রণদা প্রসাদ সাহা স্মারক স্বর্ণপদক প্রদান করেন। সেই সঙ্গে কুমুদিনী হাসপাতাল ও ভারতেশ্বরী হোমস পরিদর্শন করেন।

প্রধানমন্ত্রী দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ‘তিনি এক হাতে অর্থ উপার্জন করতেন, আরেক হাতে বিলিয়ে দিতেন। মেয়েদের শিক্ষায়, চিকিৎসায় তিনি অর্থদান করেছেন। মানুষকে মানুষের মতো বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন।’

এর আগে আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার পর হেলিকপ্টারে করে ঢাকা থেকে মির্জাপুরের কুমুদীনি কমপ্লেক্সে পৌঁছান শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে ছোট বোন শেখ রেহানাও ছিলেন।

কুমুদিনী কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে পৌঁছেই প্রধানমন্ত্রী ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের আনুষ্ঠানিকতা সারেন।

তিনি বলেন, ‘এখানে একবার এসেছিলাম, সেটা ৫৬ বা ৫৭ সালে। আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মা সহ সবাই এসেছিলেন। দীর্ঘ সময় এখানে ছিলেন। এই স্কুলটা, হাসপাতাল সব ঘুরে ঘুরে দেখেছেন তারা। খুব ছায়ার মতো আমার এইটুকু স্মৃতি মনে আছে। তবে মনে আছে এই জায়গা এতো সুন্দর দেখে বাবা বলেছিলেন আমাকে এই কুমুদিনী স্কুলে ভর্তি করে দেবেন। তবে হোস্টেলে রেখে পড়ানো আমার মায়ের খুব একটা মনোপুত ছিল না। তাছাড়া এরপর ৫৮ সালে মার্শাল ল হয়। আমার বাবাকে জেলে নিয়ে যায়। আমাদের পড়াশোনা এমনিতেই বন্ধ। পরে আর আসা হয়নি। তবে ৮১ সালে দেশে ফেরার পর আমি অনেকবারই এসেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে আসতে পেরে আজ সত্যি নিজেকে ধন্য মনে করছি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল, মা বোনদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল, সেই একাত্তর সালেই ৭ মে হানাদাররা নারায়ণগঞ্জের কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট থেকে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ও তার একমাত্র পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহাকে ধরে নিয়ে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলে। তাদের পরিবার আর কখনোই তাদের ফিরে পায়নি। স্বজন হারানোর বেদনা যে কত কঠিন, এই বেদনা যে কত যন্ত্রণাদায়ক সেটা আমরা বুঝতে পারি।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘স্বজন হারানোর বেদনা নিয়েই আমার যাত্রা শুরু। একটাই আলো ছিল, জনগণের ভালোবাসা। সেটা নিয়েই কাজ করেছি। মনে রেখেছি বাবা কী করতে চেয়েছিলেন। মনে রেখেছি তার কাজের একটুকুও যদি আমি করতে পারি সেটাই হবে আমার বড় সাফল্য। বাংলাদেশকে এখন বিশ্ব উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে দেখে। আমরা আরও অনেকদূর এগিয়ে যেতে চাই।’

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন- কুমুদিনী ট্রাস্টের পরিচালক ভাষা সৈনিক প্রতিভা মুৎসুদ্দি, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক এম এ জলিল, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হালিম, ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল হক।

অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (মরণোত্তর) এবং জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদকে ২০১৯ সালের রণদাপ্রসাদ স্মারক স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আজ যেসব প্রকল্পের উদ্বোধন করেন :

ধেরুয়া রেলওয়ে ওভারপাস; ৩৩/১১ কেভি গ্রিড সাবস্টশেন; রাবনা বাইপাস; ৩৩/১১ কেভি ইনডোর উপকেন্দ্র; ইন্দ্রবলেতা, পোড়াবাড়ী, বাসাইল, দেলদুয়ার, নাগরপুর উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন, সখিপুর উপজলো কমপ্লেক্সের প্রশাসনকি ভবন সম্প্রসারণ ও হলরুম উদ্বোধন, কালহাতী (ধুনাইল)-সয়ার হাট উদ্বোধন; মির্জাপুর উপজলো কমপ্লেক্সের সম্প্রসারিত ভবন উদ্বোধন, টাঙ্গাইল প্রেস ক্লাবের বঙ্গবন্ধু ভিআইপি অডিটোরিয়ামের উদ্বোধন, মির্জাপুর উপজলো মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স উদ্বোধন এবং উপজলো প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রের উদ্বোধন।

ভিত্তি পেল যেসব প্রকল্প :

কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ভারতশ্বেরী হোমস মাল্টিপারপাস হল এবং ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট নার্সিং কমপ্লেক্স।

এলেঙ্গা-জামালপুর জাতীয় মহাসড়ক (এন-৪) প্রশস্তকরণ প্রকল্প (টাঙ্গাইল অংশ), এলেঙ্গা-ভূঞাপুর-চরগাবসারা সড়কে ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত সেতু ও একটি কালভার্ট পুঃননির্মাণ এবং আঞ্চলিক মহাসড়কের উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপন, টাঙ্গাইল-দেলদুয়ার জেলা মহাসড়ক, করটিয়া (ভাতকুড়া)-বাসাইল জেলা সড়ক এবং পাকুল্লা-দেলদুয়ার-এলাসিন অংশের প্রশস্তকরণ প্রকল্প, কালীহাতি উপজলো কমপ্লেক্সের প্রশাসনকি ভবন সম্প্রসারণ ও হলরুম নির্মাণ, করটিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ, বাতেন বাহিনী মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, রসুলপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস, লোকেরপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ প্রকল্প।

এছাড়া দেলদুয়ার উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয় নির্মাণ, জেলা সদর মডেল মসজিদ নির্মাণ, টাঙ্গাইল সদর উপজেলা মডেল মসজিদ নির্মাণ, বাসাইল উপজলো মডেল মসজিদ নির্মাণ, টাঙ্গাইল সদর উপজলো ভূমি অফিস নির্মাণ, সখিপুর উপজেলা ভূমি অফিস নির্মাণ, মধুপুর উপজেলা ভূমি অফিস নির্মাণ, মির্জাপুর উপজলো ভূমি অফিস নির্মাণ এবং টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজের নতুন ভবন নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রসঙ্গত, উপমহাদেশের প্রখ্যাত দানবীর, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, নারী শিক্ষা ও নারী জাগরণের অগ্রপথিক দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। তার জন্ম টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। আজীবন আর্তমানবতার সেবায় কাজ করেছেন তিনি। টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দাতব্য চিকিৎসালয়। মহান মুক্তিযুদ্ধেও রয়েছে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদাররা তাকে অপহরণ করে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ গুম করে।