১৮, এপ্রিল, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ১২ শা'বান ১৪৪০

সিনেমা হলের আধুনিকায়ন চাই

আপডেট: এপ্রিল ৮, ২০১৯

সিনেমা হলের আধুনিকায়ন চাই

সব্যসাচী দাশ

প্রতি সপ্তহে মানসম্মত নতুন নতুন সিনেমা। নতুবা বিদেশী সিনেমা প্রদর্শনের অনুমতি। হল মালিকদের এমন দাবির কথা দেশের অগণিত মানুষ ইতোমধ্যে জেনে ফেলেছে। দাবি না মানলে পরিণতি কি হবে, সে কথাও জানা আছে। গেল সপ্তাহে- আমাদের চলচ্চিত্রের অতীত গৌরব, চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বর্তমান সময়ে আমাদের সিনেমা দেখার অভ্যাস। এই বিষয়গুলো আলোচনায় ছিল। এখন কথা হলো গত কয়েক বছর ধরে যেসব দুর্বল গল্পের বুনিয়াদে সিনেমা নির্মিত এবং প্রদর্শিত হচ্ছে তার সমাধান হিসেবে বিদেশী সিনেমা প্রদর্শনের যে দাবি, তা যদি সর্বসম্মতিক্রমে অনুুমতি পায় তা হলে সিনেমা হল মালিকরা কি তাদের লোকসান কাটিয়ে লাভের দেখা পাবে? এমন ভাবনা খুবই স্বাভাবিক! তা হলে সঙ্কট কি? সঙ্কট একাধিক।

জরাজীর্ণ ভবন, হলের ভেতর মিলনায়তনের বিশ্রি পরিবেশ, আধুনিক প্রযুক্তির অনুপস্থিতি, দর্শনার্থীদের যথাযথ নিরাপত্তার অভাব… এই যখন বাস্তবতা; তখন, বিদেশী কিংবা দেশী ‘বিগ বাজেট’-এর সিনেমা এ রকম ধ্যারধেরে পরিবেশে পরিবেশন করলে দর্শক কি আগের মতো হলমুখো হবে? উত্তর আমাদের জানা। একটা সময় দেশের অসংখ্য সিনেমা হল এবং এর পরিবেশ নিয়ে খুব একটা আলোচনা হতো না। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশিরভাগ সিনেমা হল প্রতিষ্ঠিত হয় সত্তর-আশির দশকে কাজেই নতুন অবস্থায় ওই হলগুলোর পরিবেশ কি ছিল না ছিল তা জনসাধারণের ভাবনায় ছিল না এবং বিকল্প উপায়ও ছিল না। কিন্তু সময় যে অনেক গত হয়েছে। হলগুলোর আসন থেকে শুরু করে যন্ত্র সবই এখন বৃদ্ধ! আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বেশিরভাগ সিনেমা হল এখন ল্যাংড়া ঘোড়া! তার ওপর চরে আনন্দের ভ্রমণ তো দূরের কথা শান্তিতে দু’দ- বসাই অসম্ভব! দীর্ঘ সময় মনুষ্য রক্ত খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট ছারপোকার দল বসার চেয়ারে স্থায়ী আবাস গেড়েছে। মাথার ওপর পুরনো জং ধরা ফ্যানগুলো কেবল ক্যাচ ক্যাচ শব্দই তৈরি করে প্রশান্তির বাতাস নয়। তা হলে মানুষ কোন্ দুঃখে হলে গিয়ে ছারপোকার কামড় বা গুমোট গরম সহ্য করবে।

সময় দ্রুতই বদলাচ্ছে। কোন কিছুর একচ্ছত্র আধিপত্য এখন আর নেই। প্রায় সবক্ষেত্রেই মানুষ একাধিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এক সময় সিনেমা মানে মিলনায়তনে অসংখ্য মানুষের গুঞ্জন বা হৈ হট্টগোলকে বোঝাত। এখন ইন্টারনেট, মোবাইল, কম্পিউটার থেকে শুরু করে রুমে রুমে টেলিভিশন। পাশাপাশি দেশী-বিদেশী অনেক প্রযোজনা সংস্থা সিনেমা বানিয়ে ইন্টারনেটে প্রিমিয়ার করছে। কাজেই সিনেমা হলে না গিয়েও দর্শক তুমুল আলোচিত বা বিশ্বব্যাপী আলোড়িত সিনেমা চমৎকার চকচকে প্রিন্ট, রুম কাঁপানো সাউন্ডে অনায়াসে উপভোগ করতে পারছে। তাহলে সিনেমা হলের কি দরকার? দরকার অবশ্যই আছে, সিনেমা তৈরিই বড় পর্দার জন্য! বিষয়টা এমন যে ‘বন্যেরা বনে সুন্দর; শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ হালের সিনেমা হলের যে অবস্থা তাতে খুব দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে দেশের বেশিরভাগ সিনেমা হলে বসে দেশী বা বিদেশী কোন সিনেমাই দেখার পরিবেশ নেই। অনেকের ইচ্ছা জাগলেও বাস্তবতা চিন্তা করে মুখ ফিরিয়ে নেন।

এই লেখার পূর্বে বর্তমান সময়ের ‘সিনেমা হলের পরিবেশ’ নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে তার পরও লিখছি, কারণ গুরুতর। আসছে ১২ এপ্রিল দেশের সব সিনেমা হল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে (যদিও এই আদেশ সাময়িক প্রত্যাহার করা হয়েছে।) হল মালিক এবং প্রদর্শক সমিতি। এমনিতে শরীরে এবং মনে অসুস্থ এই শিল্পটি অনেক দিন ধরে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। প্রাণ যাওয়ার আগে কোন মুমূর্ষু রোগীকে গলা চেপে ধরলে সেটাকে হত্যা চেষ্টা বলা হবে। যখন সুযোগ আছে হায়ার এ্যান্টিবায়োটিকেস কিংবা বর ধরনের কোন শৈল্য চিকিৎসার, তাহলে কার্যকরী কোন ব্যবস্থাপত্রের পরামর্শে না গিয়ে কেমন করে আমাদের এই শিল্পকে মৃত ঘোষণা করি! আমরা সব সময় এই শিল্পের সুস্বাস্থ্য কামনা করি। কারণ এর সুস্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে দেশের অগণিত মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য। কাজেই বিদেশী সিনেমা দেখাতে চান ভাল কথা কিন্তু ছারপোকার বংশ নির্মূল না করে কিংবা পর্দার পুরনো কাপড় না বদলিয়ে আমাদের নিমন্ত্রণ জানাবেন না। তা হলে ভবিষ্যতে আপনাদেরই বেশি ক্ষতি হবে। তখন আর কোন পথ অবশিষ্ট থাকবে না।