২৪শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং, শুক্রবার
২৯শে জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

গণপরিবহনে নারীর ভোগান্তির শেষ কোথায়?

প্রকাশিত: ৭:১০ অপরাহ্ণ , ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

গণপরিবহনে নারীর ভোগান্তির শেষ কোথায়?

সিএনআই ডেস্ক: এই বার্তাটি দিতে গিয়ে আমাদের পুলিশ বাহিনী ভুলেই গেছে, রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করবে, যা একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। বাসে উঠে একজন নারী তার চারপাশে শুধু গোয়েন্দাগিরি করতে থাকবেন? হারাধনের দশটি ছেলের মতো প্রতিটি স্টপেজে তিনি গুনতে থাকবেন, রইলো বাকি নয়, রইলো বাকি আট?

গণপরিবহনে নারীর যাতায়াত মোটেও স্বস্তিদায়ক অবস্থানে নেই। গণপরিবহনে নারীরা পরিবহন সংশ্লিষ্ট লোকজন কিংবা পুরুষ যাত্রীদের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ৯৪ শতাংশ নারী গণপরিবহনে নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার। এই ৯৪ শতাংশ সংখ্যাটি আমাদের হতাশ করে। জীবনমান ও অধিকারের ক্ষেত্রেও নারী একচোখা সমাজ রীতির সঙ্গে যুদ্ধ করেন স্রেতের বিপরীতে। এই যুদ্ধে পুরুষের কোনো অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। নারীর প্রতি অবমাননা, ইভটিজিং অথবা ধর্ষণের শিকার হলে ধর্ষকের পরিবর্তে এর শিকার হলেন যে নারী, তার জীবনাচরণই বিবেচ্য বিষয় হয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের পক্ষ থেকে গণপরিবহনে নারীর জন্য অনুসরণীয় একটি গাইডলাইন দেয়া হয়। যখন একজন নারী গণপরিবহনে ভ্রমণ করবেন, তিনি কী ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করবেন, পুলিশের বার্তাটিতে সে বিষয়ে পয়েন্ট আউট করা হয়েছে।

এই বার্তাটি দিতে গিয়ে আমাদের পুলিশ বাহিনী ভুলেই গেছে, রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করবে, যা একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। বাসে উঠে একজন নারী তার চারপাশে শুধু গোয়েন্দাগিরি করতে থাকবেন? হারাধনের দশটি ছেলের মতো প্রতিটি স্টপেজে তিনি গুনতে থাকবেন, রইলো বাকি নয়, রইলো বাকি আট? গণপরিবহনে চলাচলের সময় তাকে সারাক্ষণ অভিনয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হবে? ফোনে অভিনয় করে গলা উঁচিয়ে কথা বলতে হবে? প্রচণ্ড ক্লান্তিতে তার ঘুম চলে এলেও একদম চোখ বন্ধ করা যাবে না! তার গন্তব্যে পৌঁছার আগেই যাত্রী সংখ্যা গুনে কম দেখলেই নেমে পড়তে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বার্তাটির প্রত্যেকটি বাক্য অত্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক এবং সংবিধানের পরিপন্থী, কারণ রাষ্ট্রে সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমঅধিকার (অনুচ্ছেদ-২৭) এবং ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে সবার আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ-৩১ এবং ৩৩)। পুলিশ একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। এই বার্তার পেছনের উদ্দেশ্য অত্যন্ত সৎ হলেও বার্তাটির সারাংশ ক্রমবর্ধমান যৌন নিপীড়নের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণই প্রকাশ পেয়েছে। পুলিশের এই বার্তা অনুযায়ী নিজের নিরাপত্তার দায়ও নারীর কাঁধেই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে অত্যন্ত সুকৌশলে। ধর্ষণে যেমন নারীর পোশাক, আচরণ, স্বাধীনভাবে চলাকে দায়ী করা হয়, পুলিশের এই বার্তাটিও যেন তার সঙ্গে এক সুতোয় গাঁথা।

সম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও কিছু গাইড লাইন দিয়েছেন, একজন নারী সাংবাদিককে চলনে-বলনে কী কী বিষয় মেনে চলা উচিত। সেখানে ওই শিক্ষক উল্লেখ করেছেন, ফ্ল্যাট স্যান্ডেল পরতে হবে। (বিয়ে হোক বা না হোক) সব নারী সাংবাদিককে বিয়ের চিহ্নস্বরূপ আংটি পরে থাকতে হবে। যেন বিবাহিত নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন না! তিনি বলেছেন, ভেজা চুলে বাইরে যাওয়া যাবে না। নারীর ভেজা চুল যেন যৌনতার উপকরণ! কোনো কোনো সংস্কৃতিতে এটি যৌন সংকেত! শুধু তাই নয়, ওই শিক্ষক একটি অনলাইন পোর্টালকে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি নারী সাংবাদিকদের বোঝাতে চেষ্টা করেছি, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি তাদেরই নিশ্চিত করতে হবে।’

নারীর প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের বার্তা এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই শিক্ষকের নসিহতনামা যেন একসূত্রে গাঁথা। জীবনের নিরাপত্তার যুদ্ধেও নারী একা। তাকেই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে নানা করম কসরতের ভেতর দিয়ে, লুকিয়ে, চুপি চুপি বেঁচে থেকে ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে হবে। সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১ হাজার ২৫৩ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এর মধ্যে ৬০ শতাংশই শিশু। প্রায় ৯৮ শতাংশ নারী এবং কন্যাশিশু কখনো না কখনো পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যাত্রীকল্যাণ সমিতি কর্তৃক এক প্রতিবেদনে গণপরিবহনে ১৩ মাসে মোট ২১ জন নারীর ধর্ষণ কিংবা গণধর্ষণের ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। ২০১৮ সালে ব্র্যাক পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের গণপরিবহনে যাতায়াতকালে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময় মৌখিক, শারীরিক এবং অন্যান্যভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। এই ৯৪ শতাংশ সংখ্যাটি কী এলার্মিং নয়? আমাদের পুলিশ এই ভয়াবহ অপরাধ প্রবণতা থেকে ধর্ষকামী অপরাধীদের সংযত হওয়ার দিকনির্দেশনা দিতে পারতেন, গণপরিবহনে একজন নারীর প্রতি আচরণ কী হবে সে বিষয় সংবলিত বার্তা কিন্তু অনুপস্থিত, তা না করে যারা অপরাধের শিকার হচ্ছেন এই ৯৪ শতাংশ নারীকেই তারা সতর্ক থাকতে বলেছেন। ধর্ষণের ঘটনা দিনকে দিন বেড়ে যাওয়ার পরও কিন্তু আমরা বিচার ব্যবস্থায়ও তেমন উল্লেখযোগ্য সংস্কার দেখতে পাইনি। এ বছর মাত্র ১০ মাসে ১ হাজার ২৫৩ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার ৬০ শতাংশই শিশু। এখনো ধর্ষণ একটি জামিনযোগ্য অপরাধ।

রাষ্ট্র উন্নত হচ্ছে, দুর্নীতি, অপরাধপ্রবণতাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। সমাজ ব্যবস্থা দিন দিন পরিবর্তিত হয়, পরিবর্তন হয় দৃষ্টিভঙ্গির, বদলে যায় অপরাধের ধরন। তাই নিয়ত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংস্কারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। অপরাধের মাত্রা ও ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আইনের যথাযথ সংস্কার জরুরি হয়ে পড়ে। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমেও রাষ্ট্র দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু কার্যত আমাদের চোখের সামনে খুব ভালো উদাহরণ নেই। অপরাধ মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়েই চলেছে। ধর্ষণ এখন আমাদের রোজকার দুর্ঘটনা। কোলের শিশুটি থেকে শুরু করে অশীতিপর বৃদ্ধা পর্যন্ত জীবনযাপনের কোনো ক্ষেত্রে আমরা নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি। বরঞ্চ দিন দিন নারীর অবমাননা, ধর্ষণ, অধিকার বঞ্চনার দায়ও নারীর ঘাড়েই চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।

জন্মের পর থেকে পুরুষতান্ত্রিকতা নারীর জীবনাচরণের প্রত্যেকটি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। খাওয়া ঘুম থেকে শুরু করে হাঁটাচলা, এমনকি কতটুকু শব্দে হাসা যাবে, সেটাও নিয়ন্ত্রণ করে এই পুরুষতন্ত্র। এটা জরুরি না যে, এই বৈষম্য সবসময় পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। একজন নারীও ভীষণ রকম পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণাপ্রবণ হতে পারেন। কারণ পুরুষতন্ত্র একটি ব্যবস্থা, যা দীর্ঘদিন ধরে নারীকে অবদমন করতে করতে তৈরি হয়েছে।

পরিশেষে একটি খবর সবার চোখের সামনে রাখতে চাই, ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ বনানীর ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে ধর্ষণের শিকার হন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই তরুণী। ঘটনাটি বেশ আলোচিত ছিল। ৪০ দিন পর ৬ মে রাজধানীর বনানী থানায় আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন এক তরুণী। সম্প্রতি সাফাত আহমেদের বিদেশ গমনে বাধা না দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই ধর্ষকামী সমাজ দুই বিল্ডিংয়ের মাঝে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্রী রুম্পার গোঙানির শব্দ শুনতে পাচ্ছে কি? তনুর আলোচনা আমাদের বিব্রত করে, তাই সে কথা অনুচ্চারিতই থাকুক।

কাজী নুসরাত শরমীন: লেখক, সাংবাদিক।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।