শুক্রবার, ২৯শে মে, ২০২০ ইং

একাত্তরের ১১ সেক্টর: রণরক্তের অজানা অধ্যায়

প্রকাশিত: ১০:২১ পূর্বাহ্ণ , ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯

একাত্তরের ১১ সেক্টর: রণরক্তের অজানা অধ্যায়
সিএনআই ডেস্ক: একাত্তরে রণকৌশলের অংশ হিসেবে সুষ্ঠুভাবে যুদ্ধ পরিচালনায় বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে মোট এগারোটি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। এসব সেক্টরে হয়েছিল অসংখ্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থানে আক্রমণ, অতর্কিত হামলা ও সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তুলতে দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিল মুক্তিবাহিনী।

একনম্বর সেক্টরে ফেনীর চাঁদগাজীতে ছিল মুক্তিবাহিনীর শক্ত অবস্থান।  ৬ই জুন সকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দুটি কোম্পানি সেখানে আক্রমণ করে। দু’ঘন্টার তুমুল যুদ্ধে ৭৫ জন পাকিস্তানী সেনা নিহত হয়। ১৬ই জুন তারা আবার চাঁদগাজি দখলের জন্য এগিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধাদের প্রতিরোধে পাকিস্তানিদের ৫০ জনের মত প্রাণ হারায়।

১৭ই জুন পাকসেনারা মর্টার সজ্জিত হয়ে আবারো চাঁদগাজী আক্রমণ করে।  ১৮ই জুন ভোর ৫টা পর্যন্ত চলে মুখোমুখি যুদ্ধ। মুক্তিবাহিনীর বেশ কিছু ক্ষতি হলেও পাকসেনারা ৪৫ জনের মরদেহ ফেলে পেছনে সরে যেতে বাধ্য হয়।

দুই নম্বর সেক্টরের বিলোনিয়া যুদ্ধ সামরিক মানদণ্ডে অনন্য। ৬ই নভেম্বর রাতে ভয়ংকরতম আক্রোশে সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানিরা। দুই ঘন্টার মধ্যেই পরশুরাম দখল করে নেয় তারা। হতাহত হয় শ দেড়েক পাকিস্তানি। ১০ই নভেম্বর দুই অফিসারসহ ৭২জন পাকিস্তানি সৈন্য টাস্কফোর্স কমান্ডারের কাছে আত্মসমপর্ণে বাধ্য হয়।

মুক্তিযুদ্ধে প্রথম ট্যাঙ্কবিধ্বংসী মাইন ব্যবহার করা হয়েছিল ৩ নম্বর সেক্টরে। ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান মাত্র ১৩জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে নালুয়া চা-বাগানে সিলেট সড়কের উপর অ্যামবুশ করেন।তাতে পাকসেনাদের ৩টি গাড়ি ধ্বংস, ২টি গাড়ি বিকল এবং ৬৫ জনের মত সৈন্য নিহত হয়।

৫ নম্বর সেক্টর এলাকার টেংরাটিলা ছিল পাকিস্তানিদের একটি বড় ঘাঁটি। ৩০শে নভেম্বর সকালে মুক্তিবাহনী সেখানে আক্রমণ করে।  দিনভর চলে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে রাতের আধারে পাকিস্তানিরা তাদের যাবতীয় রেশন ও গোলাবারুদ ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে ছিল আট নম্বর সেক্টর।  ২৭শে মে পাকসেনাদের দুটি কোম্পানি মুক্তিবাহিনীর বয়রা অবস্থানের ওপর আক্রমণ করে।  তুমুল যুদ্ধে তেমন সুবিধা করতে না পেরে পিছু হটে হানাদার বাহিনী।  কিন্তু পরদিন সকালে আবার আক্রমণ করে বসে পাকিস্তানি সেনারা। ১৪ ঘন্টা স্থায়ী ওই যুদ্ধে ১৩০জনের মত পাকসেনা খতম হয়।

দশ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল নৌ-কমান্ড, সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ। এই সেক্টরের কোনো অধিনায়ক ছিলনা। দশ নম্বর সেক্টর গঠিত হয় নেভাল কমান্ডারদের নিয়ে। সমগ্র দেশের নদীপথ ও বন্দরগুলোতে গেরিলা তৎপরতা চালানোর জন্য এই সেক্টর গঠিত হয়।

আগস্ট মাসের শেষের দিকে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরে পাকিস্তানি জল জাহাজ ধ্বংস করার জন্য গেরিলা ফ্রগম্যানদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এইসব নৌ-কমান্ডোরা ১৬ই আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরে এমভি হরমুজ ও এমভি আল আব্বাস ডুবিয়ে দেয়। সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে ২১টি পাকিস্তানি জাহাজ ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

২৩শে আগস্ট সাতক্ষীরায় পাকিস্তানিদের ১টি গানবোট অতর্কিত আক্রমণ করে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। গেরিলাদের বার বার আক্রমণ, ও বিস্ফোরণের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিগুলো প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য এই আঘাত সুদূরপ্রসারী ফলাফল বয়ে আনে।

কিশোরগঞ্জ মহকুমা ছাড়া ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইল জেলাকে ১১ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।  এই সেক্টরে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ হয়েছিল। এগুলো ছিল কামালপুর আক্রমণ, বাহাদুরাবাদ ঘাট আক্রমণ, এবং নকশী আক্রমণ।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।