২৬শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং, রবিবার
৩০শে জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

বাংলা বানানের সচেতনতায় কাজ করছে ‘বাশু’

প্রকাশিত: ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ , জানুয়ারি ৭, ২০২০

বাংলা বানানের সচেতনতায় কাজ করছে ‘বাশু’

সিরাজুল ইসলাম (রাজ): বাংলা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা। ভাষাভাষীদের সংখ্যার ভিত্তিতে বাংলা পৃথিবীতে চতুর্থ, মতান্তরে পঞ্চম স্থান অধিকার করে আছে। ভাষাগত বৈশিষ্ট্য, সাহিত্য, সব মানদণ্ডেই বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তবে আধুনিক যুগে বাংলা ভাষার ব্যবহার, শব্দের ভুল কিংবা ভাষা বিকৃতির মতো ঘটনা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলা শব্দের ভুল বানান সংশোধন ও সচেতনতায় কাজ করছে ‘বানান শুদ্ধকারী (বাশু)’।

সম্প্রতি বাশু এর প্রতিষ্ঠাতা ইসফাক আহমদ (জেনন জিহান) এর সাথে বাশু’র কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেছেন সিএনআই এর নিজস্ব প্রতিবেদক- সিরাজুল ইসলাম (রাজ)। সেই সাক্ষাৎকারের একটি অংশ সিএনআই এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

১। প্রথমেই জানতে চাই বাশু আসলে কী? এর শুরুটা কীভাবে?

-বাশু হচ্ছে একটা শুদ্ধি উদ্যোগ। বানান শুদ্ধকারী বা বানান শুদ্ধি এর সংক্ষিপ্ত রূপ। মূলত ঠিক বানান, শুদ্ধ টাইপিং, বাংলা পরিচিতি এবং শিক্ষাকে গণ্ডিমুক্ত করার লক্ষ্যেই বাশু’র জন্ম।

শুরুটা ২০১৫ সাল থেকেই। তবে ছোটবেলা থেকেই বানান ঠিক করে দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিলো। বাটাভু/টাকলামি দেখলেই ঠিক করে দিতাম।

২। মুরাদ টাকলা বা বিভিন্ন ট্রল পেজের সাথে বাশু’র পার্থক্য কোথায়?

-বানান শুদ্ধিতে সবাই খুবই ভালো কাজ করছেন। তবে কিছু স্থানে মুরাদ টাকলা বা ট্রল পেজ বা বানানের গ্রুপগুলোকে নিষ্ক্রিয় দেখা যায়। তা হচ্ছে বানান ভুলে তামাশা না করা, রাজনৈতিক ব্যানার বা পুলিশি কোনো স্থানে বানান ভুল দেখেও নিরবতা। সেক্ষেত্রে বাশু তাদের উলটো আর আমরা কারো ভুল পেলে সাথে সাথে ঠিক করে দেই। অবশ্যই ইনবক্সে আর কমেন্টে করলে সেটা ঠিক করে নিলে ডিলেট করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে। বাশু’র শব্দযোদ্ধারা নিজের চ্যাটগ্রুপ ছাড়াও যেকোনো স্থানের টাকলামি বা বানান ভুল ঠিক করে দিয়ে থাকেন।

৩। এখন পর্যন্ত বাশু কী কী কাজ করেছে? বাশুর সাফল্য এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বাশু’র প্রতি মনোভাব জানতে চাচ্ছি?

-ফেসবুকের পেজ দিয়েই মূলত আমাদের অনলাইনে কার্যক্রম শুরু হয় আর অফলাইন অর্থাৎ আমরা মাঠে নেমেছি বেশি দিন হয়নি। সিলেটের এমসি কলেজে শুদ্ধ বাংরেজিতে নববর্ষ উদযাপন ও বাংলা সমীক্ষা কর্মশালার মাধ্যমেই পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মাধ্যমেই শুরু আমাদের পথযাত্রা। তারপর গত বিজয় দিবসে ভুল বানানের ফটোগ্রাফি এবং বাংলা সমীক্ষা, একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঠিক বানানের পদযাত্রা এবং ১টি।দাবি নামক কর্মশালা সম্পন্ন করি।

সরকারি ঠিক হওয়া দরকারি, বাশু বাংলা চিঠি উৎসব, পুলিশি উপাদানে বানাভিযান কর্মশালা চলমান রয়েছে।

আর অনলাইনে এবার শুদ্ধ হবে বানান, ইনবক্সে শুধরে দিবো নামক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। তাছাড়াও অনুষ্ঠানে বাজানোর মত ৮২টা নতুন পুরাতন গানের একটা ম্যাশয়াপ কম্পোজিশন করেছি বাংলা গানকে প্রাধান্য দিয়েই। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ উপলক্ষে ৩১ মিনিটের গানের মিক্সিং করেছি যা অনুষ্ঠানে বাজানো যাবে।

এছাড়াও দেশাত্মবোধক গানের ম্যাশআপ করা আছে।

সাফল্য বলতে মানুষ এখন টাইপিং করতে একটু যত্নবান হয়েছেন, বানান নিয়ে সন্দিহান হলে আমাদেরকে জানাচ্ছেন। সম্প্রতি জেলার নামকরণ নিয়ে বাশু’র বানান রীতিকে গ্রহণযোগ্য করা যায় এটা নিয়ে কথা চলছে আর ঠিক বানানে রক্তদানের যাত্রা নামক বানান শুদ্ধির ভিডিওচিত্রটি বাংলাদেশের সব রক্তদাতা সংগঠন থেকে বাহবা কুড়িয়েছে।

৪। বাশু নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে আপনাকে অনেক বাঁধা, ট্রল, অপমানিত হতে হয়েছে। এক্ষেত্রে আপনার পরিবার এবং আশপাশ এর মানুষগুলোর তখনকার মনোভাব সম্পর্কে জানতে চাই

-আসলে আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত পাগল হিসেবে পরিচিত থাকবেন যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের চিন্তাধারার কাছে আসবে না। পরিবারের সমর্থন আমার সবসময় ছিলো তবে সেটা বাস্তবিক রূপ নেয় সিলেটের কর্মশালাটি করার পর। আপনারা হয়তো জানেন আমি ডেন্টালে পড়াশোনা করছি সেটার পাশাপাশি বানান শুদ্ধিও একটা ভালো লাগার বিষয়। অনেকের কাছে ডেন্টালে থেকে বানান শুদ্ধি নিয়ে কাজ করাটা অপছন্দের। তবে এখন প্রচুর সাড়া পাচ্ছি। অবাক করা বিষয় হচ্ছে যারা একসময় তাচ্ছিল্য করছেন আজকে এসে তারাও আমাকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে আমি বলব বাশু ভাগ্যবান। আমার পিতা, বড় আপু এবং ছোট খালু, চাচাতো ভাই আমার পাশে আছেন সবসময়। লন্ডন থেকে বাবু ভাই, গুটলু ভাই এবং কোরিয়া প্রবাসী মেহেদী হাসান ভাই নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

৫। নামের বানান শুদ্ধি নিয়ে নাকি বাশু কাজ করছে?

-জি, আমাদের বক্তব্য হচ্ছে ভুল নামে নয়; বানানে। যেসব স্থানে O লেখা যায় সেখানে কেন A লিখাটা ভুল। যেমন অনন্যা কে Ononna লেখা যায়। আবার বাংলা শব্দকে বাংলিশে হুবহু প্রকাশ করা যায়। যেমন Bonani, Boshundhora, Shorkar, Podda এতে বানানী, বাসুন্ধারা, সারকের, পাদ্মা হবার সুযোগ নেই।

৬। মানববন্ধন নাকি করেছেন?

-জি, গত বইমেলাতে বান্ধobi নামে একটি বই প্রকাশ করা হয় যা বাংলাকে অবমাননা এর প্রতিবাদে এবং শব্দ অবমাননা আইন চেয়ে গত ২৮ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে আমরা মানববন্ধন কর্মশালা সম্পন্ন করি।

৭। এখনো কাজ করতে গেলে এসব সমস্যার সম্মুখে পড়তে হয় কিনা?

-শহিদ মিনারে শহিদ, শ্রদ্ধাঞ্জলিসহ প্রচলিত ভুল বানান গুলো তুলে ধরে কর্মশালা পরিচালনা করার পর মানুষ বাশুকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করেছেন। পুলিশের চেকপোষ্ট বা শিশু একাডেমীর বানানভুল নিয়ে কথা বলেছি যেখানে সবাই সাধুবাদ জানিয়েছেন। আমরা বানান শুদ্ধির কিছু ফর্মুলা বের করেছি এবং সেভাবেই কাজ করে থাকি। তাই শুরু থেকেই আমাদের কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি।

৮। বানানের বাইরে আপনি আর কী কী সামাজিক কাজের মধ্যে যুক্ত আছেন? কাজগুলো সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।

-২০১৪ সালে বিজয় দিবসের পতাকা অবমাননা থামানোর একটা কর্মশালাতে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে সামাজিক কাজের প্রতি মোহ জাগে। এরপর আস্তে আস্তে রক্তদান, পথশিশুর স্কুল সব শেষে এসে বানান। কারণ দেখা যাচ্ছে দিন শেষে আমরা বানানকেই তাচ্ছিল্য করছি।

৯। শিক্ষার সংস্কার নিয়ে বাশু কী করছে?

-শিক্ষা হোক গণ্ডিমুক্ত। এই স্লোগানে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চাই। আমাদের কিছু প্রস্তাবনা আছে। বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার, বই এর চাপ কমানো আরো অনেক বিষয়।

১০। আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের জন্য কিছু বলুন।

-পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদের নিজের প্রতিভাকে খুঁজে বের করা দরকার। শুদ্ধির শুরু নিজ থেকেই তাই ময়লা ডাস্টবিনে, ওভারব্রিজে পারাপার হওয়ার চিন্তাধারা থাকতে হবে। শেষ এটাই বলব, প্রেম ভালোবাসাতে যুক্ত হতে গিয়ে আমাদের অনেকের জীবন মূকূলেই ঝরে যায়। আসলে পরিণত বয়সে পরিণয় মানানসই। বানানের প্রতি নজর দিতে হবে এবং ইচ্ছাকৃত বিকৃতি থেকে বিরত থাকাটাই সমীচীন। রাগ, জেদ এবং সরে যাওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে, সবার সাথে কাজ করার মানসিকতার গড়ে তুলতে হবে। ধন্যবাদ আপনাকে, ধন্যবাদ সিএনআই কে।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।