২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং, বৃহস্পতিবার
২৫শে জমাদিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

একজন কর্মজীবী মেয়ের জীবনকে সহজ করে গৃহকর্মীর প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ন আচরণ আর পরিবারের সবার একটু আন্তরিকতা 

প্রকাশিত: ৩:১৯ অপরাহ্ণ , জানুয়ারি ১৬, ২০২০

একজন কর্মজীবী মেয়ের জীবনকে সহজ করে গৃহকর্মীর প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ন আচরণ আর পরিবারের সবার একটু আন্তরিকতা 
সিএনআই ডেস্ক: যে চাকরি করলে নিজ সন্তানকে কাজের মেয়েকে দিয়ে প্রতিপালন করতে হয় সেই চাকরি কি মেয়েদের সত্যিই করার কোন কারণ থাকতে পারে? এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি এরকম চাকরিজীবী মেয়ে সম্ভবত একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি নিজে,এই প্রশ্নটার যতবার সম্মুখীন হই ততবারই আমার ভীষণ রকম মন খারাপ হয়ে যায়। আমার মতে, মেয়েদের এগিয়ে যাবার পথে যতগুলো বাঁধা রয়েছে  সম্ভবত তার একটি বড় বাঁধা হল এ প্রশ্নটি!
আমি মনে করি,মাথা ব্যাথা হলে মাথাব্যাথার ওষুধ না খেয়ে মাথা কেটে ফেলার মত কঠিন সিদ্ধান্তের মত সন্তান লালন পালনের জন্য চাকরী না করা/ছেড়ে দেয়া হল একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। সন্তানকে বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে একটা মেয়ে যদি তার স্বপ্ন পূরনে এগিয়ে যেতে চায়,পরিবারের সকলের উচিত তাকে সহযোগিতা করা ।  বাসার গৃহকর্মীর প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ন কৌশলী আচরণ আর পরিবারের সবার একটু আন্তরিকতা এই দুয়ে মিলেই একজন কর্মজীবী মেয়ের জীবনকে অনেক সহজ করে তুলতে পারা সম্ভব।
নিজের কথাই বলি,প্রায়ই অফিস শেষে বাসায় গিয়ে দেখি আমার দুই বছরের ছেলেটা বাসায় গৃহকর্মীর সাথে খুব আনন্দের সাথে খেলছে। ও আমার চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোট,মা হয়নি এখনো কিন্তু সন্তান প্রতিপালনে আমার চেয়ে বহু গুনে অভিজ্ঞ। ওর সাথে আমার ছেলের সম্পর্ক দেখে আমি আশ্বস্ত হই, আস্থা পাই,বাচ্চাকে রেখে আমার বাইরে দীর্ঘক্ষন কাটাতে একটুও ভাবনা হয় না। যারা ভাবছেন এরকম গৃহকর্মী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার আমি তাদের বলব আস্থা রাখা যায়,বাচ্চার প্রতি যত্নবান হয় এরকম গৃহকর্মী পাওয়া যায় না বরং তৈরি করে নিতে হয়।
দেখুন সম্পূর্ণ অনাত্মীয় একজন মানুষ শুধুমাত্র জীবন চালানোর তাগিদে আপনার বাসায় এসেছে,হয়ত কেউ কেউ নিজের ছোট বাচ্চা ফেলে এসেছে। এরকম পরিস্থিতিতে তার নিজের জীবন নিয়েই সে থাকে হতাশাগ্রস্ত এবং অসুখী। আর একজন হতাশায় নিমজ্জিত আনন্দহীন জীবনের অধিকারী কেউ আপনার সন্তানকে খুব যত্ন আর ভালোবাসায় লালন পালন করবে এটা ভাবা খুবই বোকামী।
ভালো চাকরীগুলোতে আমরা দেখি অফিসারদের নিয়মিত বেতন, উৎসব ভাতা,সাপ্তাহিক ছুটি,মেডিকেল ফ্যাসিলিটিজ, বাচ্চাদের জন্য বরাদ্দ,বাৎসরিক পিকনিক আরো কত কি ব্যবস্থা থাকে। এটা যে ঐ কোম্পানির উদারতা তা কিন্তু না। এক অর্থে এটা হল ইনভেস্টমেন্ট। যে ইনভেস্টমেন্ট কর্মচারীদের প্রণোদিত করে ভালো কাজ করতে এবং একই সাথে কাজের মানকেও উন্নত করতে।
আমাদের বাসায় গৃহকর্মীর ক্ষেত্রেও এই পলিসি সমভাবে প্রযোজ্য। নিয়মিত বেতনই তার একমাত্র প্রাপ্য নয় এটা আমাদের মাথায় রাখা উচিত। নইলে সে সার্ভিস দিবে কিন্তু তা কোয়ালিটি সার্ভিস হবে না।
এর একটি উদাহরণ হতে পারে,রোজ বাচ্চাকে গোসল করানোটা সার্ভিস কিন্তু বাচ্চার হঠাৎ ঠান্ডা কাশি দেখলে বা হঠাৎ ঠান্ডা আবহাওয়ায় গোসল করাবার ব্যাপারে চিন্তাপূর্বক সিদ্ধান্ত নেয়া হল কোয়ালিটি  সার্ভিস।
 বাসার গৃহকর্মীকে স্নেহ,ভালোবাসা দিয়ে পরিবারের একজন করে গড়ে তোলাটা অনেকের কাছে  বাড়াবাড়ি রকমের উদারতা হলেও আমার কাছে তা সবচেয়ে লাভজনক ইনভেস্টমেন্ট। মাঝে মাঝেই আমি দিন শেষে ওর সাথে পা মেলে দিয়ে গল্প করি। ওর পরিবারের লোকদের খোঁজখবর করি,ওর নিজের আশা আকাঙ্ক্ষা গুলোও জানবার চেষ্টা করি এবং সম্ভব হলে তা মেটাবার চেষ্টা করি। আত্মীয় স্বজন যাই আসুক আমি রাত সাড়ে দশটা থেকে সকাল সাতটা এরমধ্যে তার আটঘন্টা বিশ্রাম নিশ্চিত করি। সন্ধ্যায় তাকে টিভি তে পছন্দ মত কিছু দেখতে দিই। বাইরে বেড়াতে বের হবার সময় ওকে খুব সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে বের হই। চেষ্টা ওর প্রিয় খাবার গুলোর মাঝে মাঝে ব্যবস্থা করে দিতে।
 মুসলিমদের জন্য গৃহকর্মীদের প্রতি নির্দেশ হল আমরা  নিজেরা যা খাবো তাদেরকে তাই খেতে দেব (দুঃখজনক ভাবে অধিকাংশ বাড়িতে মাছ/মাংসের সবচেয়ে ক্ষুদ্র টুকরাটি তাদের জন্য বরাদ্দ থাকে) এবং নিজেরা যা পরব তাদেরকে তাই পরতে দেব (নিজের বাতিলকৃত কাপড় গুলো না দিয়ে)।  শুধুমাত্র ধর্মীয় এই নির্দেশনা টুকুই যদি আমরা মেনে চলি তাহলেও কিন্তু গৃহকর্মী আতংকের একটা সমাধান সহ সন্তানের বেড়ে ওঠাটা অনেক সহজ,সুন্দর হয়ে যায়।
আপনার সংসারে ব্যয় করার মত পর্যাপ্ত সময় নেই আর তার সংসার চালাবার মত পর্যাপ্ত অর্থ নেই। সুতরাং এই দিক বিবেচনায় দুজনেরই সীমাবদ্ধতা আছে এবং দুজনেই একটা বিশেষ প্রয়োজনে একজন আরেকজনের শরণাপন্ন হয়েছেন। আপনি যদি তার প্রয়োজনের প্রতি যত্নবান না হোন সে কেন আপনার প্রয়োজনের প্রতি যত্নবান হবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই অনেক সমস্যার সমাধান আপনি হয়ে যায়। সহজ হয়ে যায় কর্মজীবী মায়েদের এগিয়ে যাবার প্রয়াসে বন্ধুর পথ চলা টাও!
লেখিকাঃফারিয়া আফরোজ , অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
স্পেশাল ব্রাঞ্চ,ঢাকা।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।