২৮শে মার্চ, ২০২০ ইং, শনিবার
৪ঠা শাবান, ১৪৪১ হিজরী

কক্সবাজারে ২১ ইয়াবা কারবারির আত্মসমর্পণ

প্রকাশিত: ৭:২০ অপরাহ্ণ , ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২০

কক্সবাজারে ২১ ইয়াবা কারবারির আত্মসমর্পণ

কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ  মাদকের কারনে প্রতি বছরে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হচ্ছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। দেশে যুব সমাজ ধ্বংস হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর থেকে পরিত্রাণে শুধু অভিযানই যথেষ্ট নই। গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। এমন আন্দোলনের কারনে টেকনাফের মানুষ ঘুরে দাড়াদে শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিতকায় ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশায় জেলা পুলিশের আয়োজিত অনুষ্টানে ২১ ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করেছেন। গতকাল সোমবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে টেকনাফ সরকারি ডিগ্রী কলেজ মাঠে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্টিত সভায় ২১ হাজার পিস ইয়াবা, দেশি ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩০টি গুলিসহ প্রতীকীভাবে আত্মসমর্পণ করা হয়। এরপর তাদেরকে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়।

উক্ত অনুষ্টান মঞ্চে আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারি মোহাম্মদ তৈয়ুব ওরফে মধু তৈয়ুব তার অনুভূতি জানান। তিনি জীবনে আর কোনো দিন মাদক ব্যবসা করবো না। কেননা কোন দিন শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি। এমন কি ঈদের নামাজও কখনো পড়া সুযোগ হয়নি। তাই আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়ার জন্য জেলা পুলিশকে ধন্যবাদ জানায়।

অনুষ্টানে প্রধান অতিথি পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বিপিএম (বার) পিপিএম কাছে শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণ করেন তারা। অতীত কর্মের জন্য অনুতপ্ত এই ইয়াবা ব্যবসায়ীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার শপথ নিয়েছেন। পুনর্বাসনের জন্য তারা সরকারের কাছে আবেদন জানান। এর আগে সকালে ‘সেফ হোম’ থেকে বাসে করে তাদের টেকনাফে নিয়ে আসা হয়। এ সময় আত্মীয়স্বজন দেখতে ভিড় করেন এবং অনেকে কান্নাও করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘প্রতি বছরে মাদকের ৫০ হাজার কোটি টাকা মিয়ানমারে চলে যাচ্ছে। তার বিনিময়ে আসছে মরণ নেশা ইয়াবা। এই ইয়াবা বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যারা ৫০ হাজার কোটি টাকা মিয়ানমারে পাঠাচ্ছে তাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। ফিলিপাইনে মাদক রোধে লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, তার তুলনা এখানে খুবিই নগন্য।’
যারা এখনো আত্মসমর্পণ না করে, মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না উল্লেখ করে ডিআইজি বলেন, জঙ্গি ও দূর্নীতিবাজদের মতো আমরা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। এই যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে। কেননা, এ দেশকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে। এই মাঠিতে মাদক, জঙ্গি ও দূনীতিবাজদের ঠাঁই হবে না। ফলে যে কোনো মূল্যে এই ইয়াবা পাচার বন্ধ করতেই হবে। পাশাপাশি মাদক, জঙ্গি ও দূনীতি বন্ধ হলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই দেশ উন্নত দেশে রুপান্তরিত হবে।’

পুলিশের শীর্ষ এই কর্মকর্তা বলেন,  মাদকের সঙ্গে কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদক বন্ধের নাম দিয়ে, যদি কোন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর লোকজন নিরহ কোন ব্যক্তিকে হয়রানি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আত্মসমর্পণকারীরা অতীতের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত, তাই তারা আত্মসমর্পণ করেছেন। ফলে সরকার তাদের প্রতি সুদৃষ্টি রাখবে। আত্মসমর্পণের বাইরে থাকা বাংলাদেশের সব ইয়াবা ব্যবসায়ীর উদ্দেশে বলতে চাই, ঘাপটি মেরে থেকে কেউ বেঁচে যাবে, তা যদি ভাবেন, তাহলে ভুল হবে। আত্মসমর্পণের আওতায় না এলে পরিণতি ভয়াবহ হবে। যারা আত্মসমর্পণ করছে, তাদের জন্য এক ধরনের ‘বার্তা’ আর যারা এখনও আত্মসমর্পণ করেনি, তাদের জন্য আরেক ‘বার্তা’র উল্লেখ করেন তিনি।

সভাপতির বক্তৃতায় জেলা পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বার্তা পাওয়ার পর মাদকের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে অভিযান শুরু করা হয়। এতে এ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের হাতে ২৮০ জন মারা গেছে। আমরা আর কোন মায়ের বুক খালি হোক বা কোন স্ত্রী বিধবা হোক তা-চাই না। ’
তিনি বলেন, ‘মানুষের উপস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, টেকনাফকে ইয়াবামুক্ত করতে চান আপনারা। এ এলাকার গুটি কয়েক মানুষের কারণে সাড়ে তিন লাখ মানুষের দুর্নাম হচ্ছে। ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এমন আত্ময়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়কারি রক্ষাকারি কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের এর সদস্যর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়া দেন।’

বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় জেলা কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সভাপতি তোফায়েল আহমদ বলেন,  ‘অনুষ্টানে তিন ধরনের মানুষ দেখতে পেয়েছি। কেউ মাদক কারবারি আর কেউ আত্মসমর্পণকারিদের আত্মীয়স্বজন ও সাধারন মানুষ। এখনো বড় বড় মাদক কারবারিরা অধরা রয়ে গেছে। মাদক বহন-সেবনকারিদের আত্মসমর্পণের সুযোগের পাশাপাশি বড় বড় ইয়াবাকারবারিদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে সীমান্তে মাদক পাচার বন্ধে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘কক্সবাজারে ১১ লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে শতকরা ৭৫ জন রোহিঙ্গারা এখন ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে এই সীমান্তে ইয়াবা ব্যবসা থেমে নেই। তাই রোহিঙ্গা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আইনের আত্ততায় আনতে হবে।

সভায় আরও বক্তব্যে রাখেন, জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, কমিউনিটি পুলিশিং কক্সবাজার জেলা সভাপতি এডভোকেট তোফায়েল আহমদ, সাধারন সম্পাদক সোহেল আহমদ বাহাদুর, পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদ ইসলাম, ইউএনও সাইফুল ইসলাম, টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস ও উপজেলা কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সভাপতি নুরুল হুদা ও মৌলভী কেফায়েত উল্লাহ শফিক প্রমুখ।

২১ আত্মসমর্পণকারী কারাগারে

পুলিশ জানায়, টেকনাফ মডেল থানার পরির্দশক (তদন্ত) এবিএমএস দোহার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল সোমবার ভোরে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের জাহালিয়া পাড়া মালির-মার ছড়া পাহাড়ি এলাকায় অভিযানে গেলে একদল লোক হাত উঠিয়ে আত্মসমর্পণ করে। পরে তাদের কাছ থেকে ইয়াবা কারবারিরা ২১ হাজার ইয়াবা, ১০টি অস্ত্র ও ৩০টি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় টেকনাফ মডেল থানায় মাদক ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা নং (৬ ও ৭ তারিখ ০৩-০২-২০২০) রুজু করা হয়। পরে আত্মসমর্পণকৃত ২১ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এইদিন রাতে আদালতের মাধ্যমে কক্সাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হবে বলে পুলিশ সুত্রে নিশ্চিত করেন।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস বলেন, ‘আত্মসমর্পণকারি ইয়াবা ব্যাসায়ীদের মাদক ও অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে মাধ্যামে কারাগারে প্রেরন করা হবে।

আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারীদের মধ্যে রয়েছেন, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মৌলভী পাড়া এলাকার আবুল কালাম প্র: কালা সওদাগর (৪৯), মো: রিদোয়ান (২২), আব্দুর রাজ্জাক(৩০), আব্দুল আমিন প্র: আবুল(৩৯), বশির আহম্মদ(৪০), মো: রাশেল প্র: হাজী রাশেল(২৯), ফজল করিম(২৬), উত্তর লম্বরী এলাকার মো: তৈয়ুব প্র মধু তৈয়ুব(৩৮), মাঠ পাড়া বিজিবি ক্যাম্প এলাকার মো: জাহেদ উল্লাহ (২৪), সাবরাং ইউনিয়নের লেজির পাড়া এলাকার মো: ইদ্রিস(৫৭), খয়রাতি পাড়ার মো:সাদ্দাম(২৭), সিকদার পাড়া এলাকার আব্দুল গফুর(২৬), মো: হোসন প্র: কালু(২৭), টেকনাফ পৌরসভার চৌধুরী পাড়ার মো: ইসমাইল(৩১), পুরাতন পল্লান পাড়ার আব্দুল নুর(৩৯),  হ্নীলা ইউনিয়নের ফুলের ডেইল এলাকার নূর মোহাম্মদ(২৮), সিকদার পাড়া এলাকার ইমাম হোসেন(৩০), উলুচামারী কোনার পাড়া এলাকার মিজানুর রহমান (২৩), হোয়াইক্যং উত্তর পাড়া এলাকার ফরিদ আলম(৪৮), মহেষখালীয়া পাড়া এলাকার শাহাদত হোসাইন(২৮) ও কক্সবাজারের ঝিলংজা পশ্চিম লারপাড়া এলাকার ইমাম হোসেন(৪৩)।

প্রসঙ্গত, গত ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ১০২ জন চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি ও পুলিশ মহা-পরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর উপস্থিতিতে আনুষ্টানিক আত্ন সমর্পনের পর এটি দ্বিতীয় প্রক্রিয়া।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।