বৃহস্পতিবার, ২৮শে মে, ২০২০ ইং

নষ্ট জীবনে নেই কোনও শোচনা ও তাপ

প্রকাশিত: ৫:০৮ অপরাহ্ণ , মার্চ ১২, ২০২০

নষ্ট জীবনে নেই কোনও শোচনা ও তাপ

সিএনআই ডেস্ক:

কবিকে স্বেচ্ছায় যদি ভালোবাসতে দাও
সে খঞ্জ লঙ্ঘন করবে হিমালয়গিরি।
অতএব, হে বিভাষী নারী, ঠোঁটে ঠোঁট
মেলেও এখনই- নিশি ভোর হতে আর
সামান্যই বাকি।
– রফিক আজাদ

সবারই থাকে ভাল জীবনের অন্তরালে এক নষ্টজীবন। যে জীবনের কথা কেউ কেউ জানে কিংবা জানে না। যা থেকে যায় সবার অন্তরালে। এ জীবনের ভার বয়ে বেড়ানো বড় বেশি কষ্টের এবং বেদনার। তবু কবির থাকে না এজীবনের জন্য কোন অনুশোচনা বা তিক্তবোধ। তিনি দৃষ্টিদেন নিজের সৃজনশীলতার দিকে। সৃজনশীলতা কিংবা দার্শনিকতা একটু আলাদা টাইপের ব্যাপার। আমি ছোটবেলা থেকেই তা নিজের মধ্যে অনুভব করতে থাকি। বিভিন্ন কবিতা পড়া এবং কবিদের সাথে মেশার সুযোগ তখন থেকেই হয়েছে। সেসময় এই মানুষগুলোকে আমার সাধারণ কোন মানুষ মনে হয়নি। এরা যেন আলাদা এক চিন্তাশীল মানুষ। ঠিক তাই, পরবর্তীতে বুঝতে পারি এরা সাধারণ মানুষ নই সাধারণের বেশে এক অসাধারণ।

কবি রফিক আজাদ (১৯৪১-২০১৬)। আমার প্রিয় কবিদের মধ্যে একজন অত্যাধিকপ্রিয় কবি। সেই বাল্যে রফিক আজাদকে একজন মানচিত্রখোর কবি হিসেবে চিনেছি। ভেবেছি কবি মানচিত্র খাবেন কেন? কি তার অভিমান কিংবা মানচিত্র খেলেই কি কারো উদরপূর্তি হয়? পরে জেনেছি একবিতার অন্তর্নিহিত গুঢ়্যতত্ত্ব কথা। রফিক আজাদের কবিতার মূল সুর ব্যক্তির অন্তর্গত উপলব্ধি যার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয় মা, মাটির মুখ। প্রত্নগোষ্ঠী বা উপজাতিদের যাপিত জীবন, মধ্যবিত্ত জীবন, প্রেম, মুক্তিযুদ্ধ সমকালীন রাজনীতি, প্রভৃতি ও মানুষ কৃষক জীবন সত্যানুসন্ধান, নারী ভাবনাকে অনুষঙ্গ করে কবি সাজিয়ে তোলেন কবিতার অবয়ব। কবির প্রথম দিকের কবিতায় সমাজ এবং মানুষের আনাগোনা বা বিচরণ কিছুটা অনুপস্থিত থাকলেও পরবর্তীতে কবি সমাজ এবং মানুষের সংগ্রাময় জীবন যন্ত্রণা কিংবা রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারকে অবলম্বন করে কবিতায় প্রকাশ ঘটিয়েছেন রাজনীতির মোড়কে মানুষের ভণ্ডামি আর বিপন্ন অর্থনীতি যেখানে মানবতার অবমূল্যায়ন আর মানুষের বিশ্বাসবোধে নেমে আসা অন্ধকারে।

যে কবি শক্ত হাতে ধরে ছিলো স্টেনগান- সেই কবি যুদ্ধোত্তর বিপন্ন মানুষের জীবনযন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠেন এবং হারিয়ে ফেলেছেন বিশ্বাস। আজ মানবতার অসহায় চিত্র কবিকে তাড়িত করে দেশ-বিদেশের কাগজে ছাপা হয় মানুষের মানবেতর জীবন যাপনের চিত্র। বমি করে নিজের বমি ভক্ষণ করে মানুষ। এ কি সেই দেশ যে স্বপ্নালু চোখের কার্নিশে কবি সাজিয়েছিল নতুন স্বদেশের চিত্র? দিন দিন কবির মধ্যবিত্ত মানস জীবন সংকুচিত হচ্ছে আর বিশ্বাসবোধে লাগছে দোলা। অস্তিত্ব শঙ্কটে ভুগছে কবির কবি মানস। স্বদেশ, সমাজ, জীবনসংসারে একি অন্ধকার আর শূন্যতা নেমে আসছে। তবুও কবির মনে এ থেকে পরিত্রানের আশা জাগে।

কারণ, একজন কবিতো আশাকে অবলম্বন করেই বাঁচে। প্রেমবোধ একজন সৃজনশীল মানুষকে দিতে পারে অমরত্বতে¡র স্বাদ। কবিও তখন প্রেমের স্বরূপ সন্ধানে হয়ে ওঠে পাগলপারা। প্রেম থেকেই তো যতসব সমাজ সংসার কিংবা ঘরবাঁধার আকুলি বিকুলি। মানুষের দুঃখ কবি মনকে করে নানা প্রশ্নের সম্মুখি আর এই প্রশ্নই কবিকে আরো বেশি করে তোলে দুঃখ কাতুরে। সেই কাতুরতাবোধ থেকেই কবি বললেন-
মানুষের এ্যাত দুঃখ-এ থেকে পরিত্রাণ নেই?
-বৃষ্টির প্রপাত শুনে, গাছের সবুজে চোখ রেখে
শিশুদের মুখে চুমো খেয়ে আমরা পারি না ফের
এই দুঃখী গ্রহটির অন্তগত অসুখ সারাতে?

টাঙ্গাইলের রফিকুল ইসলাম খান অর্থাৎ রফিক আজাদ ১৯৬২ তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কিছুদিনের মধ্যেই গড়ে তোলেন ‘দি স্যাড জেনারেশন, ‘স্বাক্ষরে’র মতো লিটলম্যাগাজিন। যেখানে কোনদিন আপোষ করেননি কোন সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ বা ভিন্ন মতাদর্শী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সাথে। আপোসহীন থেকেছেন স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে। ষাটের দশকে কবির প্রেমময় পঙক্তি উচ্চারণে প্রতিফলিত হয় শাশ্বত সুন্দর জীবনের স্বপ্নিল আবেশ-
‘যদি ভালোবাসা পাই আবার শুধরে নেবো জীবনের ভুলগলি’।

এ দশকে আবদুল মান্নান সৈয়দ যেমন পরাবাস্তব কবিতার চর্চা করে যাচ্ছেন সেখানে আজাদের কবিতা প্রকৃতি, প্রেম আর প্রতীকির এক ঐন্দ্রজালিক কাব্য জগৎ সৃষ্টি করে চলেছে। রফিক আজাদের প্রেমের কবিতাও কখনো দেহজ প্রেম হয়ে পাঠকের সম্মুখে ধরা দেয়নি। এ কবিতার অন্তরালে রয়েছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বদেশ, মহামারী, মৃত্যু, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, মানুষের ক্ষয়ে যাওয়া জীবনে লেগে থাকা হাহাকার কিংবা হারিয়ে ফেলা স্বপ্নকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার বাসনায় দীর্ঘশাসি মহাজীবনের প্রত্যাশায় আবার বুনে যাওয়া স্বপ্নের হাত ছানির অন্তর্জগতে রাজনীতির মেকি ভণ্ডামি কিংবা স্বেচ্ছাচারীতায় পুঁজিবাদের অক্টোপাস আঁকড়ে চোখের সম্মুখে তুলে ধরে বেদনার চিত্র। সংবেদনশীল কবি তখনই দৃঢ় প্রত্যয়ে অগ্নিমূর্তিতে চিৎকার দিয়ে ওঠেন-
‘ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ-
ভাত দে, হারামজাদা, তা না হ’লে মানচিত্র খাবো।’

কবি সব কিছু প্রত্যক্ষ করে আজ যেন নিজেকে শান্ত করে তুলেছেন। প্রতিবাদহীন নিজের মধ্যে নিজের শামুকজীবনের স্বাদ নিচ্ছেন। নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে তিনি আজ প্রশ্নবিদ্ধ এজন্যই হয়তো একজন রফিক আজাদ বলতে পারেন-
হৃদয়ে কোনোই শোক নেই-শোকানুভূতিও নেই-
অসম্ভব শান্ত আজ- সমাহিত-আমার হৃদয়।
নষ্ট করে ফেলে দেয়া জীবনের জন্যে নেই কোনো
শোচনা ও তাপ…

রফিক আজাদ ষাটের দশকে বাংলা কবিতা জগতে এক আলাদা স্বর। যার দেশের প্রতি মমতাবোধ আর স্বাজাত্যবোধই অন্যদের থেকে আলাদা এবং অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে চিহ্নিত করে তুলেছে। আমাদের প্রাচীন যুগের ঐশ্বর্যময় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, কৃষিপ্রধান সমাজকে তিনি অন্তরে লালন করতেন। তাইতো নেত্রকোনার বিরিশিরি গ্রামে নিজের অন্তরে খুঁজে পেয়েছে বেঁচে থাকার মন্ত্রণা। এ যেন তার শেকড়। সোমেশ্বরী নদী কবিকে দেয় সান্ত্বনা, বুকের জমিনে জাগায় অবিরল পরশ।
আমার সৌভাগ্য এই স্বেচ্ছায় নদীই বক্ষে তার
দিয়েছিলো ঠাঁই-আতিথ্য, আদর, সুখ।
নদী বলেছিল: ‘ভুলে যেয়ো-
আমার তো তাড়া আছে, যাই…’
আমার অবশ্য কোনো তাড়া নেই- আমি দীর্ঘসূত্রী
‘আজ থাক, কাল হবে’- ব’লে আমি ফেলে রাখি কাজ।

এতকিছুর পরেও বলতে হয় মূলত কবি রফিক আজাদ সমাজসচেতন এক প্রতিবাদী কবি। তাঁর কবিতা সমাজের অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার। এ যেন কবির হাতুড়ি পেটা জীবনে নিষ্পেষিত হতেই তার আগমন। এই রাজনীতি ব্যবসায়ীর ভণ্ডামি, সুযোগসন্ধানী, প্রবঞ্চকজীবনে বিপন্ন কবি অসহায় এটাই তার পরম ও চরম বিশ্বাস কিংবা বেঁচে থাকার একমাত্র প্রগার সন্দীপ্তি।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।