৩রা এপ্রিল, ২০২০ ইং, শুক্রবার
১০ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে নির্যাতনের শিকার ২৭৬ শিশু

প্রকাশিত: ১২:৫৭ অপরাহ্ণ , মার্চ ১৩, ২০২০

জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে নির্যাতনের শিকার ২৭৬ শিশু

সিএনআই ডেস্ক: শিশুরা খুন, ধর্ষণের পাশাপাশি নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। দেশে এর পরিমান দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। বিকৃত মানুষের লালসার শিকার হচ্ছে তারা। সব মিলিয়ে শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। এই সমস্যা আমাদের অনেক ধরেই চলে আসছে। দুটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য মতে, গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ২৭৬ শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে হত্যার শিকার হয়েছে ৮৫ শিশু। শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৪ শিশু।

সম্প্রতি আর্থিক অনটন ও পারিবারিক কলহ থেকে মা-বাবার হাতে শিশু হত্যার কয়েকটি ঘটনা স্তম্ভিত করেছে সর্বস্তরের মানুষকে। সর্বশেষ গত শনিবার সকালে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের দক্ষিণ গোড়ান এলাকার একটি বাসা থেকে দুই শিশুর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দাম্পত্য কলহের জেরে আক্তারুন্নেছা পপি তার দুই কন্যাশিশুকে হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। এর আগে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর রাজধানীর দক্ষিণখানের কেসি মডেল স্কুলের পেছনে প্রেমবাগান এলাকার একটি ভবনের পঞ্চম তলার ফ্ল্যাট থেকে মুন্নী বেগম (৩৭), তার ছেলে ফোরকান উদ্দিন (১২) ও মেয়ে লাইভার (৪) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মুন্নীকে মাথায় ভারী বস্তুর আঘাতে ও দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর থেকে মুন্নীর স্বামী বিটিসিএলের উপসহকারী প্রকৌশলী রকিবউদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে লিটন নিখোঁজ। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া একটি ডায়েরিতে লেখা ছিল, ‘আমি নিকৃষ্ট লোক। ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে খুন করা হলো। আমার লাশ পাওয়া যাবে রেললাইনে।’ এ মামলার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কোটি টাকার লোনের বোঝাসহ নানা কারণে চরম হতাশাগ্রস্ত ছিলেন রকিবউদ্দিন।

শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কামালউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশের অর্থনীতির উন্নতি হয়েছে। এর সঙ্গে আরও কিছু পরিবর্তন দরকার। সেই পরিবর্তন একসঙ্গে সমানতালে হয়নি। এখনকার বাবা-মায়েরা বিভিন্ন কারণে ব্যস্ত থাকেন। এর মধ্যে যোগ হয়েছে ফেইসবুক ও ইন্টারনেট। এসব কারণে মানুষের এখন সহিষ্ণুতা কমে গেছে। এখন স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা চরম অবহেলার শিকার

শিশুদের প্রতি সহিংসতা, শিশু হত্যা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ফল। কোনো একটি বিচ্ছিন্ন জিনিসকে উন্নত করলে এটা ঠিক হয়ে যাবে সে চিন্তা করা ঠিক না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করলে সহিংসতা কমবেÑ এটা ভাবাও ঠিক হবে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামাজিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা থেকেই বেশির ভাগ সহিংসতা ঘটছে। আমাদের এখানে খুব বেশি জোর দেওয়া উচিত। আমরা অনেক দিক দিয়ে এগিয়ে গেলেও মানসিকভাবে সামাজিক মূল্যবোধের জায়গায় একটা অসুস্থ সময়ের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছি। কিছু দিক দিয়ে উন্নতি হলেও কয়েকটা জায়গায় এখনো খুবই খারাপ জায়গায় আছি। এগুলো পরিবর্তন না করে শুধু অর্থনৈতিক বা সূচকের উন্নয়ন হলেই হবে না। সবকিছুরই উন্নতি দরকার। কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক সেটার কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না। না সমাজ, না পরিবার, না ধর্ম, না রাষ্ট্র। এর ফলে মূল্যবোধ কমে গেছে।’ এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পৃথিবী এগোচ্ছে, কাজকর্ম সবকিছু অনেক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে আমাদের চিন্তা-ধারণাগুলো খুব পিছিয়ে থাকলে আমরা খাপ খেতে পারি না। আগে যৌথ পরিবারে যে ধরনের একটা সহজ-সরল পরিবেশ ছিল, এখন আর সেই পরিবেশ নেই। প্রত্যেকেই নিজের দৌড় দৌড়ায় এখন। কে এগিয়ে যেতে পারে, কে টিকে থাকতে পারে তা নিয়ে সবাই যেন ছুটছে। এভাবে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও যে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, তাও নেই। আইনগুলো সঠিকভাবে প্রণয়ন করা এবং মানার ব্যাপারে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং সেখান থেকে বিষণœতা চলে আসছে। এই বিষণ্নতা থেকে চলে আসে মানসিক অনেক ধরনের চাপ, সমস্যা, রোগ।’

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সাদেক খান রোডে একটি বাসায় সাত বছর বয়সী এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া এক কিশোর শিশু শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ করে পরিবার। ৬ মার্চ রাত ১টার দিকে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় সাত বছরের এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। গত বছরের ২৮ জুলাই রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের ১০ বছরের শিশুসন্তানকে ব্লেড দিয়ে গলা কেটে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে তার বাবার বিরুদ্ধে। নিহত শিশু ধরম-ল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছিল। পুলিশ তার বাবা মোশাহিদ মিয়াকে (৩৫) গ্রেপ্তারও করেছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা, ধর্ষণচেষ্টা, শ্লীলতাহানি, যৌন নিপীড়ন, অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন, হত্যাসহ বেশ কিছু কারণে সহিংসতার শিকার হয়েছে ১৬১ শিশু। এর মধ্যে শুধু ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৪ শিশু। আর হত্যার শিকার হয়েছে ৩৪ শিশু।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, গত জানুয়ারি মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১১৫ শিশু। এর মধ্যে হত্যার শিকার হয়েছে ৬৩ শিশু। আসকের বার্ষিক প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। কন্যাশিশু ধর্ষণের পাশাপাশি ছেলেশিশু বলাৎকারের অনেক ঘটনা লক্ষ করা গেছে। আসক তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের হিসাব মতে, ২০১৯ সালে শারীরিক নির্যাতনের কারণে মৃত্যু, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা, অপহরণ, নিখোঁজের পর হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে নিহত হয় ৪৮৮ শিশু। ২০১৮ সালে নিহত শিশুর সংখ্যা ছিল ৪১৯। এ ছাড়া ২০১৯ সালে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয় ১৬৯৬ শিশু। ২০১৮ সালে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল ১ হাজার ১১ শিশু। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয় ১০৮৭ শিশু, ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৪৪। এ ছাড়া ২০১৯ সালে বলাৎকারের শিকার হয়েছে ৩৭ ছেলে শিশু।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ডিএমপির ৫০টি থানায় শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৭৩টি। ২০১৯ সালে মামলা হয় ৩৮৮টি।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।