৬ই এপ্রিল, ২০২০ ইং, সোমবার
১৩ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনী জনসভার মঞ্চ সংরক্ষণের দাবি

প্রকাশিত: ৩:১২ অপরাহ্ণ , মার্চ ১৬, ২০২০

ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনী জনসভার মঞ্চ সংরক্ষণের দাবি

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত মহিমাগঞ্জে প্রথম জনসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ঐতিহাসিক এ জনসভার মঞ্চটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নেয়ায় অযত্ন-অবহেলায় সকলের অগোচরেই রয়ে গেছে। মহিমাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি ভবনের বারান্দার ছাদে স্থাপিত এ মঞ্চটি সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ মানুষ এমনকি ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও জানেন না।

এদিকে ঐতিহাসিক এ মঞ্চের নিচের অংশে ভবনের প্রবেশদ্বারকে বন্ধ করে অপরিকল্পিতভাবে আরেকটি মঞ্চ স্থাপিত হওয়ায় গুরুত্ব হারিয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ওই মঞ্চটি। পরিত্যক্ত মঞ্চটি বিদ্যালয়ের সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি অপরিচ্ছন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সব মহল থেকে এখন মঞ্চটিকে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে।

মহিমাগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মতিউর রহমানসহ তৎকালীন বেশ কয়েকজন ছাত্র নেতা ও শিক্ষকের কাছ থেকে জানা গেছে ঐতিহাসিক এ জনসভার বিবরণ।

তারা জানিয়েছেন, দুই অক্টোবর, শুক্রবার, ১৯৭০ সাল। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণার জন্য তৎকালীন রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহুকুমায় প্রথম নির্বাচনী জনসভা করতে আসছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বিপুল জনসমাগমের সম্ভাব্যতা, ঢাকা থেকে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম রেলপথের সুবিধা এবং বিশাল জমায়েতের জন্য উপযুক্ত মাঠের সহজলভ্যতার জন্য বগুড়া ও রংপুর জেলার সীমান্তবর্তী শিল্পাঞ্চল মহিমাগঞ্জে এ জনসভার স্থান নির্ধারিত হয়েছে। চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মহিমাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, মহিমাগঞ্জ আলিয়া কামিল মাদ্রাসা, মহিমাগঞ্জ এক নম্বর ও দুই নম্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়) বেষ্টিত বিশাল যৌথ মাঠে আয়োজন করা হয়েছে গাইবান্ধার প্রথম নির্বাচনী জনসভা। দুদিন আগেই ঢাকা থেকে এসে পৌঁছেছে ‘কলরেডি’ কোম্পানির শতাধিক মাইকসহ নানা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। ওই দিন জুমার নামাজের শেষে জনসভা শুরুর কথা থাকলেও সকাল থেকেই দলে দলে লোক আসতে শুরু হয়েছে মহিমাগঞ্জের জনসভার স্থলে। গাইবান্ধা মহুকুমার সকল থানা ছাড়াও বগুড়া জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষে রূপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।

তারা আরও জানান, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিস্তামুখ ঘাটের রেলের ফেরিতে যমুনা নদী পেরিয়ে সান্তাহারগামী ট্রেন ঢাকা মেইলে এসে মহিমাগঞ্জ রেলস্টেশনে নামলেন বঙ্গবন্ধু। এরপর পায়ে হেঁটে বন্ধু এমাদ উদ্দিন আকন্দের স্টেশন রোডের বাসায় গেলেন দুপুরের খাবার খেতে। গাইবান্ধা মহুকুমা সদর ছাড়া রংপুর চিনিকলের কারণে স্থাপিত এখানে আরেকটি টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থাকায় তিনি আগেই ট্রাংককল টেলিফোনে দাওয়াত নিয়ে রেখেছিলেন মুসলিমলীগার এ বন্ধুর বাড়িতে। দুপুরের খাবার খেয়ে সভাস্থলের মাদ্রাসা জামে মসজিদে জুমার নামাজের জন্য উপস্থিত হয়ে তিনি দেখলেন, মসজিদ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় মাঠের মধ্যে চট বিছিয়ে নামাজে বসেছেন মুসুল্লীরা।

মহিমাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান আকন্দ সেদিনের স্মৃতিচারণ করে জানালেন, সবাই বঙ্গবন্ধুকে মসজিদের ভিতরে যাওয়ার জন্য রাস্তা ছেড়ে দিলেও তিনি তা করলেন না। তিনি বললেন, আমি পরে এসেছি তাই পিছনের সারিতে অর্থাৎ মাঠেই বসবো। তাই করলেন তিনি। এর পর নামাজ শেষে তিনি ওই মাঠেরই উত্তর পাশে জনসভার মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন।

সেদিন মঞ্চ হিসেবে সাজানো হয়েছিলো মহিমাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হল রুমের বারান্দার ছাদটিকে। ছাদে ওঠার জন্য কোন সিঁড়ি না থাকায় মহিমাগঞ্জ উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বেশ বড়সড় একটি লোহার মই দিয়ে অস্থায়ী সিঁড়ি স্থাপন করা হয়েছিল ।

এ সভার মূখ্য আয়োজক, মহিমাগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি অশীতিপর বৃদ্ধ জিন্নাত আলী প্রধান জানালেন, সে সময়ের স্থানীয় জামাত নেতাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এ সভার আয়োজনে তার সাথে থেকে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা মরহুম মাওলানা রইস উদ্দিন, তৎকালীণ
ছাত্রলীগ নেতা এ্যাডভোকেট বদরুল-উলা-লাবীব সহ অনেকে।

তিনি আরো বলেন, মহিমাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক এ মঞ্চে দাঁড়িয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানীদের অবহেলা, শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়-অত্যাচারের বর্ণনা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণের পর এই জনপদের মানুষের মধ্যে যে চেতনার সৃষ্টি হয়েছিল, অর্ধশতাব্দী পরে আজকের দিনেও তা অম্লান রয়েছে। সত্তুরের সাধারণ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের ধারাবাহিকতায় আজ পর্যন্ত এখানে যে কোন নির্বাচনে আওয়ামীলীগের কোন প্রার্থী পরাজিত হননি।

সেদিনের জনসভার কিশোর স্বেচ্ছাসেবী ও বর্তমানে বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা কৃষিবিদ পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মশিউর রহমান বাবলু ঐতিহাসিক এ মঞ্চটি সংরক্ষণের পাশাপাশি এর নিচে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের রাস্তা আটকে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত সৌন্দর্য বিনষ্টকারী পরিত্যক্ত মঞ্চটি সরিয়ে নেয়ার দাবী জানান।

মহিমাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃতি শিক্ষার্থী, বর্তমানে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ প্রধান
ঐতিহাসিক এ মঞ্চটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।