মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২০ ইং

সংবাদ কর্মীদের জন্যও খাদ্য-নিরাপত্তা জরুরী

প্রকাশিত: ৪:২০ অপরাহ্ণ , এপ্রিল ১৪, ২০২০

সংবাদ কর্মীদের জন্যও খাদ্য-নিরাপত্তা জরুরী

এস কে দোয়েলঃ  মহামারী করোনা ভাইরাস আজ বিশ্বব্যাপী মহা ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সংক্রামক এ ব্যাধিতে ঘরে-বাইরে বিপদের আশঙ্কা। চলছে অস্ত্রবিহীন তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ। এই অস্ত্রবিহীন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে টিকে থাকতে, আক্রান্ত দেশগুলোর মানুষদের বাঁচাতে ঘুম হারাম করে ফেলেছে রাষ্ট্র পরিচালকদের। ঘুম হারাম করেছে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের। যে ভাইরাসটি ক্ষণে ক্ষণে জিন পাল্টাচ্ছে, তার সঠিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কোন ভ্যাকসিনে সম্ভব তা চেষ্টার কোন শেষ নেই।

এই দুঃসময়ের পরিস্থিতিতে বসে নেই গণমাধ্যমও। নিজের জীবন বাজি রেখে সংবাদ, তথ্য, উপাত্ত, চিত্র সংগ্রহ করে তুলে ধরছেন সংবাদমাধ্যমে। কঠিন এ পরিস্থিতি উত্তরণে সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্ব গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীরাও। বিশ্বে ২০৯ টি দেশ আক্রান্ত হয়েছে। প্রাণহানি ছাড়িয়েছে লাখেরও বেশিতে।

আক্রান্তের সংখ্যা ১৬ লাখ। এতো সরকারি হিসেবের সংখ্যা তত্ত্ব। মহামারী করোনা আক্রান্তের উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে প্রতিদিন হিসেবহীন মানুষ। সরকারি হিসেবে উপস্থাপন না হলেও সংবাদকর্মীরা ঠিক পৌছে
দিচ্ছেন সেই হিসাববিহীন খবর। পদে পদে ঝুঁকি। নেই নিরাপত্তা, নেই প্রটেকশন কোন ব্যবস্থা। রাষ্ট্রের
চতুর্থ স্তম্ভের গুরুত্বপূর্ণ কর্মশীল যোদ্ধা হয়েও কঠিন এ পরিস্থিতিতে তাদের জন্য যেন সরকারের নেই কোন
ভাবনা। কারণটা কি, কারণটা জানা থাকলেও বলার সুযোগ নেই।

১০ এপ্রিল যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম মিরর ইউকে-তে প্রকাশিত ফ্লিট স্ট্রিট ফক্স নামের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিকের নিবন্ধ চোখে পড়লো। বিশ্বের এ মহা দূর্যোগের ক্রান্তিকালে সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের গুরুত্ব কী, তা তিনি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একসঙ্গে ব্রিটিশ নাগরিক এত মারা যাননি, যে পরিমাণ মানুষ এই করোনা ভাইরাসের কারণে মারা যাচ্ছে। এ মহামারী ভাইরাস দেখিয়ে দিয়েছে সবার জন্য উন্মুক্ত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা, দেখিয়ে দিয়েছে জিন ম্যাপিং, ভ্যাকসিন তৈরি আর বিজ্ঞানের কী দশা তা। আর সবচেয়ে বেশি যে ব্যাপারটি করোনাভাইরাসের এ প্রাদুর্ভাবের সময় প্রমাণিত, তা হলো যদি সাংবাদিকরা যদি না থাকতেন তাহলে আরো বহু পরিমাণ মানুষের মৃত্যু হতো।

বিশিষ্ট এ সাংবাদিক নিবন্ধে আরো বলেছেন, সাংবাদিকরা যে সংবাদ প্রকাশ করে তা প্রথমে তারা বিশ্বাস
করে নেয় না, তারা তদন্ত করে, নিশ্চিত হয়ে খবর তৈরি করে। এরপর তা দ্বিতীয়, তৃতীয়বার পর্যন্ত সংবাদটি
সম্পাদনা করা হয়। কারণ, সাংবাদিকতা ছাড়া গুজব লাগামহীন হয়ে পড়তে পারে এবং হয়তো লুটপাটও শুরু হয়ে
যেতে পারে। পুলিশ হয়তো তার নতুন পাওয়া ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার শুরু করে দেবে। মানুষ হয়তো মনের আনন্দে সৈকতে ছুটে যাবে, যার ফলে ঘটবে আরো সংক্রমণ, আরো মৃত্যু। পরিশেষে তিনি লিখেছেন, আমরা
(সাংবাদিকরা) নিখুঁত নই, আমরা কারো পছন্দের ব্যক্তি নই, আমরা কখনো আপনাদের ধন্যবাদ চাই না; আমরা
শুধু এটুকু নিশ্চিত হতে চাই যে আপনি আপনাকে নিয়ে আপনি ভাবছেন কি না।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশে গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য এখন পর্যন্ত সরকার কোন কিছু
ভাবেননি। বিশ্বব্যাপী করোনা থাবায় প্রতিদিন মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। চীন, আমেরিকা, কানাডা,
জার্মানী, ইতালি, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলো টালমাতাল হয়ে পড়েছে করোনার ভয়ংকর
থাবায়। বিশ্বের কোথায় কোন দেশ কখন আক্রান্ত হচ্ছে, কতজন মারা যাচ্ছে, কতজন আক্রান্ত হচ্ছে, রোগীর
সার্বিক অবস্থা, চিকিৎসক, মৃতদের নিয়ে কী শঙ্কা, দাফন-কাফন, বিশেজ্ঞদের বিশ্লেষণ, নাগরিকদের মতামত এর
সবকিছু জানতে পারছে মানুষ আজ ঘরে বসে টিভিতে চোখে রেখে, ইন্টারনেট ব্রাউজ করে আর খবরের কাগজ
পড়ে। অথচ ঝুঁকিপন্ন পেশায় নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে মাঠে থেকে দেশের মানুষের কাছে সবধরণের খবর
পৌছাতে নিরন্তর কাজ করে চলেছে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের সরকার কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, কোথায়
লকডাউন, কোথায় শার্টডাউন. অর্থনৈতিক পর্যালোচনসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপট সাংবাদিকদের দায়িত্ব
পালনের মাধ্যমে জানতে পারছে মানুষ। অথচ ঝুঁকিপন্ন মাঠে এসব সংবাদ কর্মযোদ্ধাদের নেই মূল্যায়ন, এখন
পর্যন্ত অবমূল্যায়নের দৃষ্টিতে দেখার কারণে না কোন প্রনোদনা, না কোন সহযোগিতা আশ্বাস এসেছে
সরকারের কাছ থেকে।

করোনা থাবায় দেশ ক্রমশ বিপর্যয়ের দিকে এগুচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩৯জনের মৃত্যু দিয়ে ৮০৩ জন আক্রান্ত হয়েছে।
প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত-মৃত্যুর সংখ্যা। সরকার উদ্ভট পরিস্থিতি মোকাবেলার লক্ষে নিয়েছেন বিভিন্ন
পদক্ষেপ। যেকোন ধরণের জনসমাগম এড়াতে ও সামাজিক দূরত্ব তৈরিতে চলছে অঘোষিত লকডাউন। কোথাও
কোথাও লকডাউন। করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মোকাবেলায় ঘোষণা করেছেন ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার
প্রনোদনা প্যাকেজ। কৃষকদের উৎপাদনের জন্য প্রনোদনা প্যাকেজ। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় প্রত্যক্ষভাবে
নিয়োজিত যেসব ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সম্মানী পুরস্কার ঘোষণা। দায়িত্ব পালনকালে এদের কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ও বীমার ব্যবস্থা করা হবে। সেই সাথে পদমর্যাদা অনুযায়ী ৫-১০ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্যবীমা করা হবে। মৃত্যুর ঝুঁকি আছে বা মৃত্যুবরণ করলে তাদের জন্য এই বীমা ৫ গুণ বৃদ্ধি করে দেয়ার ঘোষনা দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য কি করলেন, তাতো বললেন না। আজ
মহামারী করোনা প্রকোপে ঝুঁকিপন্ন হওয়ায় সংবাদমাধ্যমের অবস্থাও বেশি ভালো নয়। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক
পত্রিকার মুদ্রন। প্রিন্ট ভার্সন বন্ধ করে চালু রাখা হচ্ছে অনলাইন সংস্করণ। কোন কোন পত্রিকা আগাম ঘোষনা
ছাড়াই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক সংবাদকর্মীর চাকরি হারানোর আতঙ্কের সৃষ্টি হচ্ছে। জীবন-
জীবিকায় চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। তাদের তো বকেয়াসহ বেতন-ভাতা প্রদান করা হচ্ছে না। ইতিমধ্যে
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ইন্ডিপেনডেন্ট, দীপ্ত, এটিএনবাংলা ও একটি পত্রিকার সাংবাদিক করোনায়
আক্রান্ত হয়েছেন। তারা যাদের সাথে মিশেছেন, তাদেরকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। ফলে তাদের
পরিবারের সদস্যদেরও কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এতে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে
আতঙ্ক। স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়নি এখনো। করোনা বিস্তারের এই কঠিন সময়ে
সারাদেশের মাঠে-ঘাটে কর্মরত সংবাদকর্মীদের সুরক্ষাসহ অবিলম্বে জরুরী।

মফস্বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত পেশাদারী সংবাদকর্মী রয়েছে। কারো সম্মানীভাতা আছে, কারো
নেই। তবুও বছরের পর বছর কাজ করে যাচ্ছে। করোনা এ উদ্ভট পরিস্থিতিতে থমকে গেছে জীবনযাত্রা। অঘোষিত
লকডাউনে অর্থ সংকটের সাথে পরিবারে নেমে এসেছে খাদ্য সংকট। মধ্যবিত্তদের পর্যায় এসব মফস্বল
সংবাদকর্মীদের পরিবার। যাদের পেশাদারিত্বে সাংবাদিকতার জীবনে রাজধানীর (গণমাধ্যমের স্থায়ী
নিয়োগপ্রাপ্ত) সাংবাদিকদের মতো না আছে বেতন, না আছে কোন উৎসব ভাতা। দু’চারটি প্রথম শ্রেণির
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সামান্য কিছু ভাতা প্রদান করে থাকে। বাকিদের তো তাও মিলেনা। তারাও কিন্তু বৈশ্বিক এ
দূর্যোগের সময় ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছে। দিনভর অক্লান্ত পরিশ্রম করে সঠিক সংবাদটি সংবাদমাধ্যমে
পাঠিয়ে দিচ্ছে। তাদেরও তো সুরক্ষা প্রয়োজন। ভাতার প্রয়োজন। খাদ্য ও নিরাপত্তা প্রয়োজন। মহামারী এ
কঠিন পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত ব্যক্তিদের ন্যায় না পারছে লজ্জায় কারো কাছে সহায়তা চাইতে, না পারছে পরিবার-
পরিজনের মুখে সেই আগের মতো খাদ্য সরবরাহ্ধসঢ়; করতে। দু’তিন দিন আগে এক জৌষ্ঠ সাংবাদিক ভারাক্রান্ত
চিত্তে সোস্যাল মিডিয়া ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘আমার মত সংবাদকর্মীদের কে সহায়তা দেবে? আমার
গণমাধ্যমের সম্মানীর উপর নির্ভর করেই সংসার চলে। আজ মাসের ১০ তারিখ বাংলাদেশ বেতার এবং পত্রিকা থেকে এখনো কোন সম্মানী পাইনী। দোকানদাররা আর বাকি দিতে চায় না। আজ পকেটে একটাকাও নেই। আর চলছে না।

 

কোন বন্ধু, বড় ভাই, ছোট ভাই ও সহকর্মী দয়া করে আমার মত সংবাদ কর্মীদের আর্থিক সহায়তা করতে
এগিয়ে আসুন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শোধ করে দিব। আরেকজন লিখেছেন, প্রায় একমাস বাড়িতে বসে
আসি। আয়-রোজগার নেই। কারো কাছে তো লজ্জায় বলতেও পারছি না। সইতেও পারছি না। এরকম হতাশা তৈরি
হচ্ছে মফস্বল সংবাদকর্মীদের। বাড়ছে অর্থ ও খাদ্য সংকটের সমস্যা। এই কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের জন্য খাদ্য ও
নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশের সকল গণমাধ্যমের কার্যালয়ের দায়িত্ব পালনের। তিনটি টেলিভিশন ও একটি
পত্রিকার সাংবাদিকের করোনা পজিটিভ হওয়ার ঘটনায় আতঙ্ক বেড়েছে পুরোদমে। অনেক অনলাইন ভার্সনের
অফিস হয়ে উঠেছে সম্পাদকের বাড়ি। মুদ্রিত সংবাদপত্রের সঙ্কটে পড়ার প্রেক্ষাপটে দৈনিক মানবজমিন পর্যন্ত
সাময়িক ছাপানো বন্ধ করে শুধু অনলাইন সংস্করণ চালু রেখেছে। ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে
আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকার প্রিন্ট। তবে অনলাইন ভার্সন চালু রেখেছেন। সরকারি-বেসরকারি অফিস ছুটি
হয়ে যাওয়ার কারণে বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অফিসে কর্মরতদের আসা-যাওয়াটাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
অনেক সংবাদপত্র তাদের পৃষ্ঠা সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি বাংলা দৈনিক ২৪ পৃষ্ঠার বদলে
এখন ছাপছে ১২ পৃষ্ঠা। যুগান্তরের মতো পত্রিকার অনলাইন ভার্সন চালু রয়েছে। প্রিন্ট ভার্সনের ক্ষেত্রে পৃষ্ঠা
সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন তারা। গণপরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় কয়েক দিনে পত্রিকার বিক্রি ৭৫ শতাংশ কমে
গেছে। এ কঠিন পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ থাকতে বাড়িতে ফিরেছে অনেক হকাররা। এজেন্টরা নিচ্ছেন না
পত্রিকার কাগজ। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের দিকে অতি দ্রুত নজর দিতে হবে মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী আপনাকেই।

এস কে দোয়েল
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।