মঙ্গলবার, ৭ই জুলাই, ২০২০ ইং

বাণিজ্যে করোনাদ্বারা আক্রান্তের প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত খাত হলো পর্যটন

প্রকাশিত: ১:৪৩ অপরাহ্ণ , এপ্রিল ২০, ২০২০

বাণিজ্যে করোনাদ্বারা আক্রান্তের প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত খাত হলো পর্যটন

তানভীরুল আরেফিন লিংকনঃ প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (PATA), বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি থেকে জুন, ২০২০ পর্যন্ত মোট পাঁচ মাসে সার্বিক পর্যটন শিল্পে ৯,৭০৫ কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৩,০৯,৫০০ জন তাদের চাকুরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। এর মাঝে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বাদে অন্যান্য বেসরকারি এয়ারলাইন্সে ৬০০ কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ২,০০০ জন, হোটেল/রিসোর্ট এবং রেঁস্তোরায় প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ২,৫০,০০০ জন, ট্রাভেল এজেন্সিতে ৩,০০০ কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ১৫,০০০ জন, ট্যুর অপারেশনে ৪,০৫০ কোটি টাকা (ইনবাউন্ড, আউটবাউন্ড ও ডোমেষ্টিক) এবং কর্মহীন প্রায় ৪১,০০০ জন, পর্যটন পরিবহণ ও পর্যটনবাহী জাহাজে ৫৫ কোটি টাকা এবং কর্মহীনের সংখ্যা হবে প্রায় ১,৫০০ জন। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল এভিয়েশন, হোটেল-রিসোর্ট ও পর্যটন খাতে নিয়োজিত পরিবহন সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এগুলোর অন্যতম স্টেকহোল্ডার ট্যুর অপারেটর এবং তাদের গাইড। ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ(TOAB) থেকে একটা ধারণা দেয়া হয় যে, এই খাতে ক্ষতি প্রায় ৫৭০০ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটন খাত দুইটা বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।

একঃ লকডাউন পরিস্থিতিতে কিভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা যায়।

দুইঃ লকডাউন তুলে নেওয়ার পর কিভাবে প্রতিষ্ঠানকে চাঙ্গা করা যায়। সরকার অবশ্য এই খাতের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এটা দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে কর্মচারীর বেতন, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল এর সংস্থান হবে কিন্তু সামগ্রিকভাবে মন্দা কাটিয়ে উঠতে অনেকগুলো ফ্যাক্টর চলে আসবে।

প্রথমতঃ আমাদের এখনো কোনো ধারণা নেই কতদিন পরে এই অবস্থার অবসান হবে। দ্বিতীয়তঃ জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি কত দ্রুত মন্দা কাটিয়ে উঠতে পারবে। তাছাড়া সরকারি ব্যয় এবং ঋণ প্রদানের ফলে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা থাকবে।

প্রতিটি সেবারই মূল্য বেড়ে যাবে । তৃতীয়তঃ মহামারীউত্তর মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন হওয়া অস্বাভাবিক নয় । এমন হতে পারে মানুষ কিছুটা বিলাসিতা পরিহার করবে কিংবা সমাজকল্যাণমূলক কাজে খরচ বাড়াবে।

চতুর্থতঃ প্রত্যেক দেশের সরকারই চাইবে রপ্তানি নির্ভর শিল্পের দিকে বেশি নজর দেওয়ার জন্য। ফলে প্রত্যেক দেশই বহির্গমন ভ্রমণের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতে পারে। সেক্ষেত্রে নিজ দেশের মুদ্রার অবমুল্যায়ন করতে পারে। যার ফলে ডলারের সাথে স্থানীয় মুদ্রার এক্সচেঞ্জ রেট বেড়ে যাবে ।

পঞ্চমতঃ যেকোনো মহামারীর পর মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যগত ব্যাপার নিয়ে একটা ভীতি কাজ করে। তাছাড়া ভ্রমণ পরিবেশ তথা খাওয়া-দাওয়া সবখানে মানুষ পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে আরও সচেতন থাকবে। সব মিলিয়ে পর্যটন খাতকে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে হবে। এমতাবস্থায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে দুর্যোগ উত্তরণের জন্য:- খরচ যত ন্যূনতম অবস্থায় রাখা যায় তার চেষ্টা করতে হবে। সেবামূল্যে আকর্ষণীয় ছাড় দিয়ে মানুষকে আবার পর্যটনমুখী করতে হবে। মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা পর্যটনের অনুকূলে আনার জন্য পর্যটন যে একটা মানসিক প্রশান্তির জায়গা সেটা তুলে ধরতে হবে। প্রাথমিকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন এর উপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন চাহিদা তৈরি করতে পারলে এটা সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে যার ফলে জিডিপি বাড়বে। ট্যুর প্যাকেজগুলোতে স্বাস্থ্যঝুঁকি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। আর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা সংযোজন করতে হবে এবং গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে আকর্ষণীয় ও নতুনভাবে উপস্থাপন করতে হবে। আর এইসব প্রচেষ্টার মধ্যে সরকারকেই বড় ভূমিকা নিতে হবে।

বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ধরে রাখার ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে। মনে রাখতে হবে পর্যটনে বিনিয়োগ মানে কিন্তু এক টাকা বিনিয়োগে বহুগুণে ফিরে আসা। কারণ একজন পর্যটক যখন ভ্রমণ করে তখন পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, গাইড, ট্যুর অপারেটর, স্থানীয় কমিউনিটি তথা বহুবিধ চাহিদার সৃষ্টি করে। আমি বলবো পর্যটন খাতে বিনিয়োগ লিনিয়ার কিংবা বাইনারিও না, এটা জ্যামিতিক হারে বেড়ে জিডিপিতে ধনাত্মক প্রভাব ফেলবে। মন্দা কাটিয়ে ওঠা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অভ্যন্তরীণ যে চাহিদা সৃষ্টি ও মুদ্রার গতিশীলতা আনতে হয় তা পর্যটন খাতের বিনিয়োগে হতে পারে অন্যতম কার্যকরী ব্যবস্থা ।

আশাকরি আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াব। আবারো আমরা বেড়াতে বের হব। তবে ততদিন আমরা ঘরে থাকবো যতদিন না আমাদের পৃথিবী ভাইরাসমুক্ত হচ্ছে।

 


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।