মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২০ ইং

করোনা যুদ্ধে ভাল অবস্থানে বাংলাদেশ (১ম পর্ব)

প্রকাশিত: ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ , এপ্রিল ২৪, ২০২০

করোনা যুদ্ধে ভাল অবস্থানে বাংলাদেশ (১ম পর্ব)

এম নাঈম হোসেন: সারা পৃথিবীতে করনাভাইরাস (কোভিড১৯) ২১০ টি দেশ ও অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করেছে। সবগুলো দেশই আজকে এই ভয়ানক ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। আজকে আমি আমার দেশের মানুষের জন্য ওয়ার্ল্ডমিটার থেকে এমন সব তথ্য আর পরিসংখ্যান উপস্থাপন করবো যা দেখে আপনারা যারা প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারবেন। মনে রাখবেন আতঙ্কিত অবস্থায় আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

এই যুদ্ধে আমরা সমগ্রজাতী যে অবস্থানে টিকে আছি এর জন্য ঘরে থাকাটা এবং নিয়ম কানুন মেনে নিজেকে সুরক্ষিত রাখাটা সবচেয়ে জরুরী। সরকারের লকডাউন মেনে না চললে আমাদের এই অবস্থান ওলটপালট করে ফেলতে খুব বেশী সময়ের প্রয়োজন হবে না। সুতরাং ঘরে থাকুন।

নিচে চারটি বিষয়ে ২২শে এপ্রিল ২০২০ (সন্ধ্যা) পর্যন্ত ওয়ার্ল্ডমিটারের (www.worldometers.info) পরিসংখ্যান গুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করুনঃ

১। বিশ্বে সর্বমোট আক্রান্তের সংখ্যা এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতিঃ

২২শে এপ্রিল ২০২০ (সন্ধ্যা) পর্যন্ত পুরো পৃথিবীর আক্রান্তের সংখ্যা ২,৫৮০,৬৭১ জন মানুষ। ওয়ার্ল্ডমিটারের তথ্য অনুসারে এর শুরু ২২শে জানুয়ারী ২০২০ যেদিন সংখ্যাটা ছিল ৫৮০ জন। তার মানে প্রায় ৩ মাসের মধ্যে পৃথিবীতে প্রায় ২৫,৮০,০৯১ জন লোক আক্রান্ত হয়েছে এবং এই সংখ্যা প্রতি মুহূর্তে বেড়েই চলেছে, কি ভয়ানক ব্যাপার।

কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের জন্য এর মধ্যেও ভীতি কমানোর একটি তথ্য আছে এখন সেটা দেখুন। এই ২৫,৮০,০৯১ আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ১৫ টি দেশেই আক্রান্তের সংখ্যা ২,১৫৬,৯১৪, যা মোট আক্রান্তের ৮৪%।

সেই ১৫ টি দেশ হচ্ছেঃ আমেরিকা (৮১৯,৩২১), স্পেন (২০৮,৩৮৯), ইটালি (১৮৩,৯৫৭), ফ্রান্স (১৫৮,০৫০), জার্মানি (১৪৮,৭৬৬), ইউকে (১২৯,০৪৪), তুরস্ক (৯৫,৫৯১), ইরান (৮৫,৯৯৬), চায়না (৮২,৭৮৮), রাশিয়া (৫৭,৯৯৯), ব্রাজিল (৪৩,৫৯২), বেলজিয়াম (৪১,৮৮৯), কানাডা (৩৮,৪২২), নেদারল্যান্ড (৩৪,৮৪২), সুইজারল্যান্ড (২৮,২৬৮)।

বাকি ১৯৫ টি দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪২৩,৭৫৭ জন। তার মানে এই ১৯৫ দেশে গড়ে প্রতিদেশের আক্রান্তের হিসেব আসে ২,১৭৩ জন করে। আমাদের দেশ এই ১৯৫ দেশের মধ্যেই একটি। ২২শে এপ্রিল পর্যন্ত আমাদের আক্রান্তের সংখ্যা ৩৭৭২ জন, যা কিনা গড় পড়তা মানের থেকে বেশী, অন্য অনেক দেশ থেকেই কম। তার মানে সময়ের পরিক্রমায় আমরা এই ১৯৫ দেশের মধ্যেই অবস্থান করছি ভালভাবে। ঘরে থাকুন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকুন, পরিবার কে সময় দিন।

২। পৃথিবীর সর্বমোট মৃত্যু এবং বাংলাদেশের অবস্থানঃ

ওয়ার্ল্ডমিটারের তথ্য অনুসারে ২২শে এপ্রিল ২০২০ (সন্ধ্যা) পর্যন্ত পুরো পৃথিবীতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা হচ্ছে ১৭৯,০৬৯ জন। কিন্তু এই ১৭৯,০৬৯ জন মৃত মানুষের মধ্যে ১৬৫,৫৭১ (৯২%) জন মানুষের মৃত্যুই হয়েছে ১৫ টি দেশের মধ্যে।

দেশ গুলো হচ্ছে, আমেরিকা (৪৫,৩৫৫), ইটালি (২৪,৬৪৮) স্পেন (২১,৭১৭), ফ্রান্স (২০,৭৯৬), ইউকে (১৭,৩৩৭), বেলজিয়াম (৬,২৬২), ইরান (৫,৩৯১), জার্মানি (৫,১০২), চায়না (৪,৬৩২), নেদারল্যান্ড (৪,০৫৪), ব্রাজিল (২,৭৬৯), তুরস্ক (২২৫৯), সুইডেন (১,৯৩৭), কানাডা (১,৮৩৪), সুইজারল্যান্ড (১,৪৭৮)।

বাকি ১৯৫ টি দেশে মৃত্যুর সংখ্যা ১৩,৪৯৮ (৮%) জন। যদি আমরা এই ১৯৫ টি দেশের মৃত্যুর গড় পড়তা মানের হিসেব করি তা দাঁড়ায় প্রতি দেশে ৬৯ জন করে। বাংলাদেশে ২২শে এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১২০ জনের, যা কিনা গড় পড়তা থেকে একটু বেশী। তর্কের খাতিরে যদি আমরা গড় পড়তা সংখ্যাটিকে (৭৫) অথবা আমাদের সংখ্যাটিকে (১২০) দশগুন/বিশগুণ/তিরিশগুন ও করি, তবুও সংখ্যাটি ৪,০০০ ছাড়াবে না। সুতরাং আমাদের দেশে ৫০০,০০০ থেকে ২০,০০,০০০ লোক মারা যাওয়া ওয়ার্ল্ডমিটারের হিসেব মতেই সম্ভব না। আসুন আমরা বাস্তববাদী হই, অকারনে আতঙ্ক না ছড়াই, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকি এবং ঘরে থাকি, ইনশাআল্লাহ্‌ জয় আমাদের হবেই।

৩। নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা এবং কোথায় আমরাঃ

নমুনা পরীক্ষা নিয়ে আমাদের দেশের মানুষের মনে একটি অসম্ভব রকমের হতাশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটা ঠিক যে আমাদের নমুনা পরীক্ষা অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। আমি এশিয়া মহাদেশের কয়েকটি দেশের সাথে নমুনা পরীক্ষার একটা বিশ্লেষণ তুলে ধরব, যেহেতু আমরা দক্ষিন এশিয়ার একটি দেশ।

ওয়ার্ল্ডমিটারের মতে ২২শে এপ্রিল ২০২০ (সন্ধ্যা) পর্যন্ত বাংলাদেশ নমুনা পরীক্ষা করেছে ৩২,৬৩০ জনের, শনাক্ত হয়েছেন ৩,৭৭২ (১২%)। একই সময়ে ভারতের নমুনা ৪৬২,৬২১ শনাক্ত ২০,৪৭১ (৪%)। পাকিস্তান নমুনা ১১৮,০২০ শনাক্ত ৯,৭৪৯ (৮%)। । শ্রীলঙ্কা নমুনা ৭,৩৯৩ শনাক্ত ৩২১ (৪%)। জাপান নমুনা ১২৪,৫৫০ শনাক্ত ১১,৫১২ (৯%)। মালয়েশিয়া নমুনা ১১০,১০৯ শনাক্ত ৫,৫৩২ (৫%)। থাইল্যান্ড নমুনা ১৪২,৫৮৯ শনাক্ত ২৮২৬ (২%)। সিঙ্গাপুর নমুনা ৯৪,৭৯৬ শনাক্ত ১০,১৪১ (১১%)। ভিয়েতনাম ২০৬,২৫৩ শনাক্ত ২৬৮ (০.১৩%)। সাধারণত নমুনা সংগ্রহের পরিমান যত বাড়ে শনাক্তের শতকরা হার ততো কমে আসে।

এখন যদি আমরা আমাদের নমুনা পরীক্ষার সংখ্যাটিকে (৩২,৬৩০) ৪ গুন করি তা দাঁড়ায় ১৩০,৫২০ জনে। যেটা পাকিস্তান, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের নমুনা পরীক্ষা থেকেও বেশী, থাইল্যান্ডের কাছাকাছি প্রায়। এই ১৩০, ৫২০ এর ১২% শনাক্ত ধরলে দাঁড়ায় ১৫,৬৬২ জন। বিশ্বের সামগ্রিক পরিস্থিতির বিবেচনায় সেটা খুব বেশী না। এখন আশা করি বুঝতে পারছেন নমুনা পরীক্ষাতে আমরা কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও খুব হতাশ ও আতঙ্কিত হয়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো কিছুই হয়নি। সুতরাং আতঙ্কিত না হয়ে, বাসায় থাকুন এবং খুশি মনে পরিবারকে সময় দিন।

৪। বিশ্বে মৃত্যুর শতকরা হার এবং বাংলাদেশঃ

২২শে এপ্রিল ২০২০ (সন্ধ্যা) পর্যন্ত পৃথিবীতে সর্বমোট আক্রান্ত ২,৫৮০,৬৭১ জন আর মৃত্যু হয়েছে ১৭৯,০৬৯ জনের। পুরো পৃথিবীতে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর শতকরা হার ৭%।

মৃত্যুর শতকরা হারের পরিমাপে যে দেশগুলো এগিয়ে আছে তারা হচ্ছে – বেলজিয়াম ১৫%, ইউকে ১৩%, ইটালি ১৩%, ফ্রান্স ১৩%, নেদারল্যান্ড ১২%, সুইডেন ১২%, স্পেন ১০%, মিসর ৮%, ব্রাজিল ৬%, ইরান ৬%, চায়না ৬%, আমেরিকা ৬%।

এশিয়ার কয়েকটি দেশের দিকে তাকালে আসে বাংলাদেশ ৩%, ভারত ৩%, জাপান ২.৪%, পাকিস্তান ২%, শ্রীলঙ্কা ১.৪%, থাইল্যান্ড ২%, মালায়শিয়া ২%, সিঙ্গাপুর ০.১%। এখানেও মনে রাখা প্রয়োজন যে সাধারণত নমুনা পরীক্ষা ও শনাক্তের সংখ্যা যত বাড়ে শতকরা মৃত্যুর হার ততটাই কমে আসে। আমরা জানি যে চিকিৎসা বিজ্ঞানে আমরা খুব এগিয়ে নেই, তবুও কিন্তু তথ্য ও পরিসংখ্যান বলছে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় মৃত্যুর শতকরা হারের অনুপাতেও আমরা এগিয়ে আছি।

আমরা নিজের দেশকে নিজেরাই একটু বাহাবা দিতে শিখি, আতঙ্ক না ছড়াই এবং লকডাউন মেনে ঘরেই থাকি। আমাদের বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রশাসনের নির্দেশ মোতাবেক যা যা করনীয় তাই করি, নিজেরাই নিজেদের বোকামিতে তীরে এসে তরী না ডুবাই। জয় আমাদের সন্নিকটে ইনশাআল্লাহ্‌।

আমি আমার প্রবন্ধের দ্বিতীয় পর্বে চেষ্টা করবো করোনার শেষ কবে সে বিষয়ে তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে একটি বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ দিতে।

প্রবন্ধ: করোনাভাইরাস ও বাংলাদেশ (১ম পর্ব)

লেখক: এম নাঈম হোসেন, সভাপতি, নাগরিক ঢাকা।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।