মঙ্গলবার, ৭ই জুলাই, ২০২০ ইং

করোনা দূর্যোগ সাংবাদিকদের ঝুঁকি, প্রণোদনা তালিকা ও কিছু কথা

প্রকাশিত: ১২:১১ অপরাহ্ণ , এপ্রিল ২৯, ২০২০

করোনা দূর্যোগ সাংবাদিকদের ঝুঁকি, প্রণোদনা তালিকা ও কিছু কথা

এস কে দোয়েল:  গ্রামাঞ্চলের একটা কথা বলে, ‘যে লাউ, সেই কদু’। অর্থাৎ যা ভেবেছিলাম, তাই হলো। আশার চাঁদ আশায়-ই রইলো। মাঝখানে চাঁদ ছোব ছোব বলে আর হলো না, সেই দুরাশাই থেকে গেল। স্বপ্ন ধূসর বলে আরেকটি কথা আছে। আসলে মফস্বল সাংবাদিকদের যে কপাল ভালো না, তা ডিইউজে ও বিএফইউজে কর্তৃক মাননীয় তথ্যমন্ত্রীর হাতে ৫ হাজার ৭৭১ সাংবাদিকের তালিকা প্রণয়ন খবর দেখলেই বুঝা যায়। এ তালিকা দেখে দেশের অনেক সাংবাদিকদের বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কার সাথে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

কারণ ডিইউজে ও বিএফইউজে’র যাদের সদস্য হওয়ার ভাগ্য লাভ হয়নি, তারা কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সংবাদকর্মীদের জন্য প্রণোদনার আর্থিক সহায়তা পাবেন না? বিশ্বজুড়ে মহামারী করোনা ভাইরাসে মোকাবেলায় সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একে একে নিয়েছেন প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু সে উদ্যোগ যথাপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না অসৎ কিছু মানুষদের কারণে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সেই সাড়েসাত কোটি মানুষের কম্বল ঘটনার আক্ষেপটা মনে পড়ে গেল। লোকে পায় সোনার খনি, আর আমরা পাই চোরের খনি। যা করোনা পাদুর্ভাব সরকারের গৃহিত পদক্ষেপের চাল-ডাল-তেল চুরির ঘটনা দেখে। যাই হোক, সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না।

মফস্বল সংবাদকর্মীরা সংবাদমাধ্যমের প্রাণ। গণমাধ্যমে সারাদেশে সংবাদ পরিবেশন করতে হলে মফস্বল সংবাদকর্মীরাই একমাত্র ভরসা। তাই তাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। কারণ এই মফস্বল সংবাদকর্মীদের তেমন বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়না। মুষ্টিময় প্রথম শ্রেণির কয়েকটি গণমাধ্যম ব্যতিত বাকী সব সংবাদমাধ্যম তাদের কোন সম্মানী ভাতা প্রদান করেন না। শুধু একটি আইডি কার্ড, নিয়োগপত্র নিয়েই বছরের পর বছর অবৈতনিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করে সংবাদ প্রেরণ করে আসছে এই মফস্বল সংবাদকর্মীরা। পরিশ্রম, সময় ও ইন্টারনেট বিল নিজ খরচে বহন করেও সাংবাদিকতা পেশাকে আকড়ে ধরে রাখে মূলধারার সাংবাদিকরা। অথচ এদেরই মূল্যায়ন হয় না কখনো।

সুনজর পড়ে না কখনো কিভাবে চলে তাদের সংসার। বিশ্বজুড়ে মহামারীভাবে ছড়িয়ে পড়া করোনা পাদুর্ভাব মোকাবেলায় ঘোষণা করা হয়েছে লকডাউন। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সকল কর্ম প্রতিষ্ঠান। ঘরে থাকা ঘোষনায় ঘরবন্ধী হয়ে পড়েছে মানুষ। একমাসের বেশি দিন চলছে এ লকডাউন। এতে করে কর্মহীনতায় অর্থ সংকটের সাথে চলছে খাদ্য সংকট। মধ্যবিত্তদের তালিকায় এসব মফস্বল সংবাদকর্মীর মুখে রুমাল চেপে সয়ে যাচ্ছে অর্থ-খাদ্য সংকটের অপ্রকাশ্য যন্ত্রণা। কে দেখবে? দেখার তো কেউ নাই। করোনা মোকাবেলা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে সবাইকে প্রণোদনা প্রদান করেছেন।

যাতে কেউ দুর্ভোগে পড়ে ভেঙ্গে না পড়ে। না খেয়ে থাকে। কর্মচাঞ্চল্য থাকে। তার জন্য প্রথম প্রনোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন ৭২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। পরে কৃষকও যাতে এই মহা দুর্যোগের মধ্যে ফসল ফলাতে পারে, সেজন্য ৫ হাজার কোটি ভুতুর্কি প্রণোদনা করেছেন। ঘরবন্ধী মানুষদের জন্য খাবার পৌছে দিতে সকল প্রকার নিদের্শনা প্রদান করেছেন। কিন্তু এই মফস্বল সংবাদকর্মীদের চাপা যন্ত্রণা কাটছে না।

সবারই যখন হলো, তখন এ প্রণোদনা থেকে বাদ পড়লো গণমাধ্যম/সংবাদমাধ্যম কর্মীরা। মহামারী এ দুর্যোগের কারণে ঝুকি নিয়ে মাঠে থেকে তথ্য সংগ্রহ করা এ সংবাদকর্মীদের জন্য কিছু করতে বললেন শীর্ষ গণমাধ্যমের নেতৃবৃন্দ। উনারা আমাদের সিনিয়র। অভিভাবক। সাংগঠনিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি। ভরসা করি। কিছু একটা হলে আমরাও তো অংশীদার হব।

অন্যায় হলে প্রতিবাদ করি। মানববন্ধনে, লিফলেট গলায় ঝুলিয়ে স্লোগান ধরি। করোনা এ উদ্ভট পরিস্থিতিতে দেশের সংবাদমাধ্যমের মফস্বল সংবাদকর্মীদের নিয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সেটার প্রারম্ভিক বিষয়টি আশার আলো দেখিয়েছিল। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)
সাংবাদিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবির বিষয়টি আশা তৈরি করেছিল। পেশাগত দায়িত্ব পালন কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে থাকা সাংবাদিকদের জন্য উনারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথাটি উপস্থাপনে দেশের প্রতিটি কর্মরত সংবাদকর্মীদের বুকে একটা আস্থা সঞ্চা করেছিল। মনে হয়েছিল, এ কঠিন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের জন্য তাহলে কিছু করা হচ্ছে। এর সাথে আরেকটি সুখবর চোখে পড়লো সেটি হচ্ছে, প্রেস কাউন্সিল দেশের সকল জেলার প্রশাসকের কাছে কর্মরত সাংবাদিকদের তালিকা করে পাঠানোর নির্দেশ পত্র। এ নির্দেশপত্র দেখে দেশের সকল মফস্বল সংবাদকর্মীরা দূর্ভোগে থেকেও কষ্ট নিয়েও আশার হাসি দিয়েছিলেন। যখন মাননীয় তথ্যমন্ত্রীর হাতে পৌছানো হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৭৭১ সাংবাদিকের তালিকা। তখন সেই
উদিত হাসি নিভে গেছে ঝরা ফুলের মতো। তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের
(ডিইউজে) ৩ হাজার ১৬০, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) ৪০২, খুলনা সাংবাদিক
ইউনিয়নের (কেইউজে) ১১৪, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের (আরইউজে) ৩৮, ময়মনসিংহ
সাংবাদিক ইউনিয়নের (এমইউজে) ৬৬, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের (জেইউজে) ৭৬, বগুড়া
সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিইউজে) ৬৮, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিবিইউজে) ৭৬,
নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের (এনইউজে) ৪৬, কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের (জেইউকে) ৭৬ এবং বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের (জেইউবি) ৫৯ জন রয়েছেন। এছাড়া সব জেলার মূলধারার গড়ে ৩০ সংবাদকর্মী করে ৫৩ জেলায় মোট এক হাজার ৫৯০ জন, যা সব মিলিয়ে ৫ হাজার ৭৭১ জন সাংবাদিকের তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে (জাগো নিউজ২৪.কম)। এখানেই তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। এখানে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে দুটি সংগঠনের ১১টি শাখা মিলেই রয়েছে ৪ হাজার ১৮১ জন। উনারা তো সাংগঠনিক ভিত্তিতে শাখাসমূহ হিসেব করে সাংবাদিকের সংখ্যা অনুসারে তালিকা করলেন। বাকি ৫৩ জেলার মূলধারার সাংবাদিক মাত্র ১ হাজার ৫৯০ জন দেখালেন। আসলে এই ১ হাজার ৫৯০ জন সাংবাদিক কারা হচ্ছেন, কারা ভাগ্যজয়ী হচ্ছেন এ প্রণোদনার? যতদূর জানি, দেশের ৬৪টি জেলাতেই প্রেসক্লাব কিংবা রিপোর্টার্স ইউনিটির মতো অনেক সাংবাদিক সংগঠন রয়েছে। তাদের তালিকা কোথায়। তাদের সংখ্যা কত? তারা কি এ প্রণোদনা হতে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন। না তারাও প্রণোদনা ভুক্ত হবেন।

এটা নিয়ে দেশের মফস্বল সংবাদকর্মী, সাংবাদিক সংগঠনের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেক ক্ষোভ প্রকাশে বিভিন্ন স্টেটাস, মন্তব্য দেখা গেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সাংবাদিক বান্ধব; তাতে কোন সন্দেহ নেই। হয়তো তিনি দেরিতে
সাংবাদিকদের প্রণোদনা দিতে দেরিতে ঘোষনা দিয়েছেন। হয়তো সাংবাদিকদের ধৈর্য পরীক্ষা
নিয়েছেন। প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে দেশের সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে সাংবাদিকদের
তালিকা প্রস্তুত করে পাঠানোর উদ্যোগটি ফলপ্রসু হতে পারে। এটা বাস্তবায়িত হলে এই দুর্যোগ
মুহুর্তে এ প্রণোদনা আর্থিক সহযোগিতা মফস্বল সংবাদকর্মীদের কাছে পৌছবে বলে মনে করি।
এতে বঞ্চিত হবার আশঙ্কা তৈরি হবে না। একটি আনুমানিক পরিসংখ্যান দেখানো যেতে পারে, দেশের ৬৪টি জেলা শহরেই ৩০-৩৫ জন সংবাদকর্মী রয়েছে।

আর প্রতিটি জেলার উপজেলাগুলোতে ২০-৩০ জন সংবাদকর্মী রয়েছে। তাহলে দেশের ৬৪টি জেলার ৪৯২টি উপজেলা রয়েছে। সে হিসেবে জেলা প্রশাসনের মাধ্যম অতি অল্প সময়ের মধ্যে মূলধারার সাংবাদিকতায় কর্মরত সংবাদকর্মীদের তালিকা প্রস্তুত করে পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেস তৈরি করে এ প্রণোদনার আর্থিক সহযোগিতা সঠিক সুন্দরভাবে সারাদেশে সাংবাদিকদের কাছে পৌছানো গেলে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা ঘটবে না বলে মনে করি। কারণ সংবাদকর্মীদের প্রণোদনা দিতে প্রেস কাউন্সিলের প্রেরিত চিঠিটি দেশের সকল সাংবাদিকসহ মফস্বল সংবাদকর্মীদেরও আশা সঞ্চার করেছে। সোস্যাল নেটওয়ার্ক ফেসবুকে এ চিঠির হাজারো মন্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।

মহামারী করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে যারা জীবন বাজী রেখে সবচেয়ে
বেশি ঝুকি নিয়ে কাজ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ডাক্তার নার্স, পুলিশ ও সাংবাদিকরা। এই তিন পেশার মানুষদের বলা হয় করোনা যোদ্ধা। এই করোনা যোদ্ধাদের মধ্যে মফস্বল সাংবাদিকরা অর্থ ও খাদ্য সংকটে পড়েও তথ্য সংগ্রহের কাজে মাঠে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক স্যার মহামারী করোনা দূর্যোগ সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনে সংবাদকর্মীরাও প্রথম সারির সৈনিক বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেছেন, “গণমাধ্যমই এই সংকটের সময়ে মানুষকে তথ্য দিচ্ছে, তথ্যের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছে। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে, সারা দেশ, সারা বিশ্ব এখন কোন জায়গায় অবস্থান করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রন্টলাইনে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের মধ্যে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা যেমন আছেন, এর সঙ্গে যুক্ত আছে গণমাধ্যমও। গণমাধ্যম ছাড়া তো মানুষ অন্ধকারে থাকবে। এই অবস্থায় গণমাধ্যমের কর্মী, সাংবাদিক, সম্পাদক, কলাকুশলী, সম্প্রচার ও মুদ্রণ মাধ্যমে যাঁরা আছেন, তাঁরাও এখন প্রথম সারির সৈনিক হিসেবে কাজ করছেন। সে কারণে গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টদের ঝুঁকিও অনেক বেড়ে গেছে। সংবাদকর্মীদেরও সেসব জায়গায় যেতে হচ্ছে যেখানে করোনা আক্রান্ত রোগী রয়েছেন, যেখান থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটছে, সেসব জায়গায় গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা তথ্য তুলে আনছেন, ছবি সংগ্রহ করছেন। এটা করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে পড়ছেন। কিন্তু এই কাজ না করেও তো কোনো উপায় নেই। পৃথিবীকে তো চলতে হবে, থেমে থাকলে হবে না। এসব কারণে গণমাধ্যমের যে গুরুত্ব সেটা সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করছে, সারা বিশ্ব উপলব্ধি করছে” (কালের কন্ঠ, ২৭ এপ্রিল/২০২০)। এ ক্রান্তিকালে মফস্বল সংবাদকর্মীরা যাতে দূর্ভোগে অর্থ ও খাদ্য সংকটে ভোগে মানবেতর জীবন যাপন না করে সেদিক চিন্তা-বিবেচনা করে অতি দ্রুত বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত আর্থিক সহযোগিতা সারাদেশের জেলা-উপজেলায় কর্মরত সংবাদকর্মীদের কাছে পৌছাতে অনুরোধ সকল সংবাদকর্মীর।

এস কে দোয়েল
সাংবাদিক, সংগঠক ও কলামিষ্ট
তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।