মঙ্গলবার, ৭ই জুলাই, ২০২০ ইং

শুভ জন্মদিন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, বিনম্র শ্রদ্ধা

প্রকাশিত: ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ , মে ৪, ২০২০

শুভ জন্মদিন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, বিনম্র শ্রদ্ধা

আবু আলম শহীদ খান: তিন মে, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম-এর জন্মদিন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের কাছে জাহানারা ইমাম দেশপ্রেম, ত্যগ ও সংগ্রামের অনন্য প্রেরণার উৎস। ১৯২৯ সালের ৩ মে মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম জুড়ূ। বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম। তিনি লেখিকা, কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি শহীদ শফি ইমাম রুমীর মা এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’র আহ্বায়ক। শহীদ শফি ইমাম রুমী একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। হানাদার বাহিনীর সদস্যদের বর্বর নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেন।

জাহানারা ইমাম-এর ছেলেবেলার অনেকটাই কেটেছে রংপুরে। বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ১৯৪১ সালে কুড়িগ্রাম থেকে বদলি হয়ে যান লালমনিরহাটে। সেই আমলে লালমনিরহাটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার সেন্টার ছিলো না। তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন রংপুর থেকে। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন রংপুর কারমাইকেল কলেজে। গর্ব করে বলতে পারি আমিও সেই কলেজের ছাত্র। সেখান থেকে আই.এ. পাস করে ১৯৪৫ সালে জাহানারা ইমাম ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ থেকে বি এ পাস করেন ১৯৪৭ সালে। ১৯৬০ সালে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে। ১৯৬৪ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশীপ নিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সানডিয়াগো স্টেট কলেজে। সেখান থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে বাংলায় এমএ পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

সহকারী শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে। তিনি ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বুলবুল একাডেমি কিন্ডারগার্টেন স্কুল এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করেন। কিছু দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন।
জাহানারা ইমামের লেখা ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দলিল। অনবদ্য গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি ছাড়াও তার উল্লেখযোগ্য রচনাপঞ্জির মধ্যে রয়েছে: ‘অন্য জীবন’, ‘বীরশ্রেষ্ঠ’, ‘জীবন মৃত্যু’, ‘শেক্সপীয়রের ট্রাজেডি’ ‘চিরায়ত সাহিত্য’, ‘বুকের ভিতর আগুন’, ‘দুই মেরু’, ‘নাটকের অবসান’ ‘নিঃসঙ্গ পাইন’, ‘নয় এ মধুর খেলা’, ‘ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস’, ‘প্রবাসের দিনলিপি’ ইত্যাদি। আছে শিশুতোষঃ ‘গজকচ্ছপ’, ‘সাতটি তারার ঝিকিমিকি’, ‘বিদায় দে মা ঘুরে আসি’। অনুবাদ গ্রন্থ- ‘জাগ্রত ধরিত্রী’, ‘তেপান্তরের ছোট্ট শহর’, ‘নদীর তীরে ফুলের মেলা’। ১৯৯১ সালে তাকে দেয়া হয় বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার। অথচ ১৯৯২ সালে জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অ-জামিনযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৯৭ সালে তাকে দেয়া হয় স্বাধীনতা পদক।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জাহানারা ইমাম সবসময় ছিলেন সক্রিয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ ঘাতক-দালালদের পুনর্বাসনে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী নাগরিক কমিটি’, ‘স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি’ ইত্যাদি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা করে এবং পত্র-পত্রিকায় লিখে জনসচেতনতা গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। তার অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায় ১৯৯২ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’র আহ্বায়ক হবার পর। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মী, তরুণ-যুব সমাজ তার আহ্বানে বিপুল সাড়া দেয়।

জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসে ঐতিহাসিক ‘গণআদালত’। প্রশাসন আর পুলিশের সব বাধা ভেঙ্গে লাখ লাখ মানুষ জমায়েত হয় সেখানে। আমি, আমার স্ত্রী নার্গিস মিনি, আর কন্যা শময়িতা সেখানে ছিলাম। শময়িতার বয়স তখন নয়। আমরা টিএসসি’র সামনে। চারিদিকে শত শত ছাত্র-ছাত্রী। স্লোগানে উত্তাল চারিদিক। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লোহার গেটে তালা লাগিয়ে অপর পাশে দাঙ্গা পুলিশের দল। আমি শময়িতার হাত ধরে আছি। হঠাৎ শময়িতা এক ঝটকায় আমার হাত ছেড়ে সেই লোহার গেটের দিকে ছুটল। আমি তার পিছু নিলাম। আমাদের পেছনে আরো কয়েকজন। পুলিশের সাথে শময়িতার বাকযুদ্ধ। কেন আমদের ভেতরে যেতে দেয়া হবে না। শুরু হল জোর করে গেট খোলার চাপ। এক পর্যায়ে ভেঙ্গে পড়লো গেটের তালা। শহীদ জননীর সভাপতিত্বে সেদিন লাখ লাখ বিচারপ্রার্থীর উপস্থিতিতে ঘাতকদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হলো।

তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির নামে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করে। তবু থেমে থাকেননি জাহানারা ইমাম। মামলা মাথায় নিয়েই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে থাকেন। কিন্তু মরণব্যধি ক্যান্সার তাঁর সাহসী যাত্রাপথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ২রা এপ্রিল ১৯৯৪, চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সেটাই ছিল তাঁর শেষ যাত্রা। বাকশক্তি হারিয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ছোট ছোট চিরকুট লিখে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি কাঁপা কাঁপা হাতে লিখতেন আন্দোলনের কথা। বুঝতে পেরেছিলেন হাতে বেশী সময় নেই। লিখলেন একটি চিঠি-

“আমার সহযোদ্ধা বন্ধুগণ, আপনারা গত তিন বছর একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। এ লড়াই আপনাদের, দেশবাসী অভূতপূর্ব একতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আন্দোলনের শুরুতে আমি আপনাদের সঙ্গে ছিলাম। আমাদের অঙ্গীকার ছিল, লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত কেউ রাজপথ ছেড়ে যাবো না।

মরণব্যাধি ক্যান্সার আমাকে মরণ কামড় দিয়েছে। আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি। রাজপথ ছেড়ে যাইনি। মৃত্যুর পথে বাধা দেবার ক্ষমতা কারোর নেই। তাই আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি এবং অঙ্গীকার পালনের কথা আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই। আপনারা অবশ্যই আপনাদের কথা রাখবেন। আন্দোলনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে থাকবেন।

আমি না থাকলেও আমি জানবো, আমার কোটি কোটি বাঙালি সন্তানেরা আপনাদের পুত্র-কন্যাদের নিয়ে মুক্ত সোনার বাংলায় বসবাস করছেন। এই আন্দোলন এখনো দূরপথ পাড়ি দিতে হবে।
দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-মুক্তিযোদ্ধা-নারী-ছাত্র-যুবশক্তি-নারীসমাজসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ এই লড়াইয়ে আছে।
তবু আমি জানি, জনগণের মতো বিশ্বস্ত আর কেউ নয়। জনগণই সকল শক্তির উৎস। তাই গোলাম আযম ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে দায়িত্বভার আমি আপনাদের বাংলাদেশের জনগণের হাতে অর্পণ করলাম। নিশ্চিত জয় আমাদের হবেই।”

২২ জুনের পর থেকে তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। কোনও খাবার খেতে পারছিলেন না। চিকিৎসকরা জানিয়ে দিলেন আর কিছুই করার নেই। ২৬ জুন ১৯৯৪ মিশিগানের ডেট্টয়েট নগরীর সাইনাই হাসপাতালের বিছানায় ৬৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

লেখক: সাবেক সচিব।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।