শনিবার, ৩০শে মে, ২০২০ ইং

করোনায় মৃতদের লাশ দাফনকারীদের অবদান জাতি মনে রাখবে

প্রকাশিত: ৩:৫২ পূর্বাহ্ণ , মে ১৫, ২০২০

করোনায় মৃতদের লাশ দাফনকারীদের অবদান জাতি মনে রাখবে

করোনাভাইরাস মহামারীর সবচেয়ে মন খারাপ করা দৃশ্যটি হল মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের বিষয়টি। কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে বা এর লক্ষণ নিয়ে যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের শেষ বিদায় জানাতেও যেতে পারছেন না প্রিয়জনরা।

আক্রান্ত ব্যক্তির মরদেহ ফেলে রেখে যাওয়ার মতো অমানবিক ঘটনাও ঘটেছে দেশে। এমন প্রেক্ষাপটে মানবতার সেবায় যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে, ইসলামী এনজিও সংস্থা আল-মারকাজুল ইসলামী তাদের মধ্যে অন্যতম।

সংকটকালীন এ পরিস্থিতিতে সংস্থাটি সবার আগে এগিয়ে যাচ্ছে এবং মৃত ব্যক্তিদের চূড়ান্ত দাফন-কাফনের কাজ সম্পন্ন করছে।

হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিয়ে, সরকারি নির্দেশাবলী অনুসরণ করে বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তাদের নিজেদের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। মৃতের গোসল, কাফন এবং জানাজাও পড়াচ্ছেন।

আল-মারকাজুল ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হামজা ইসলাম জানান, দেশে সংকট শুরুর পর স্বাস্থ্য অধিদফতর করোনায় মৃত ব্যক্তিদের লাশ দাফনে আল-মারকাজুল ইসলামীর সহায়তা চায়।

তখনই স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রস্তাবে সম্মত হন তারা। হামজা ইসলাম যুগান্তরকে জানান, গত সোমবার পর্যন্ত শুধু ঢাকাতেই ২৩১টি লাশ দাফন করেছেন তারা।

তিনি বলেন, গত ২৯ মার্চ প্রথম রাজধানীর খিলগাঁও-তালতলায় করোনায় মৃত সন্দেহভাজন এক নারীর লাশ দাফনের মাধ্যমে আল-মারকাজুল ইসলামী আনুষ্ঠানিক কাজটি শুরু করে। বর্তমানে ৩ মহিলাসহ ১৭ জন কর্মী এবং ৪টি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে করোনায় মৃত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের লাশ দাফনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি বেশি অবনতি হলে আরও ২২টি অ্যাম্বুলেন্স রিজার্ভ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

মানবতার এ সংকটে আল মারকাজুল ইসলামী শুধু মুসলিম নয়, ধর্মীয় পরিচয় ছাপিয়ে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সেবায়ও এগিয়ে এসেছে। সোমবার পর্যন্ত ২৬ সনাতন ধর্মাবলম্বীর সৎকারের ব্যবস্থা করেছেন তারা।

করোনায় সংক্রমিতদের গোসলের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করছেন বলে জানান হামজা ইসলাম।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাসে মৃত ব্যক্তিদের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেরা একটি পদ্ধতি তৈরি করেছে। প্রথমে ৬০ ভাগ অ্যালকোহলের সঙ্গে ৪০ ভাগ পানি মিশিয়ে তৈরি করা দ্রবণ মৃতদেহের গায়ে স্প্রে করা হচ্ছে। এরপর একটি পাম্পিং মেশিনের সাহায্যে মৃতদেহ প্রচুর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হচ্ছে এবং তার গোসল বা অজু সম্পন্ন করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত ১৯৮৮ সালে নড়াইল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুফতি শহিদুল ইসলাম প্রথম আল-মারকাজুল ইসলামী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই এ সংস্থাটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

জাতির এ ভয়াবহ দুর্যোগকালে আল-মারকাজুল ইসলামী বাংলাদেশের মানবতাবাদী কার্যক্রমে বিভিন্ন সংস্থা ও দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ অনেকেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ ছাড়া করোনা পজেটিভ ও উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া রোগীদের দাফন-কাফন ও সৎকারে প্রশাসনকে সহায়তা করছে আলেমদের বেশ কয়েকটি সংগঠন। তার মধ্যে কয়েকটির কার্যক্রম দেশব্যাপী বিস্তৃত আবার কোনো কোনোটি স্থানীয় পর্যায়েও কাজ করে যাচ্ছে।

করোনা সংকটে ত্রাণ কার্যক্রম ও লাশ দাফনে সহায়তা করে যাচ্ছে মাওলানা গাজী ইয়াকুবের নেতৃত্বাধীন ‘তাকওয়া ফাউন্ডেশন’। করোনা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সংগঠনটি লিফলেট বিতরণ, শুকনো ও তৈরি খাবার বিতরণ, জীবাণুনাশক স্প্রে, লাশ দাফনসহ বহুমুখী সেবা পরিচালনা করছে।

মাওলানা গাজী ইয়াকুব বলেন, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ৩৮টি টিম গঠিত হয়েছে, তাকওয়া ফাউন্ডেশন তাদের পিপিই সরবারহ করেছে। তারা স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে করোনা পজিটিভ ও করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারীদের লাশ দাফনে সহায়তা করছে।

আলেমদের সমন্বয়ে আরেকটি সেবামূলক সংগঠন ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশন লাশ দাফনের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ৭০টি স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করেছে, যাদের অধীনে এক হাজার কর্মী প্রস্তুত আছেন।

রাজধানী ঢাকায় তারা এখনও লাশ দাফনের অনুমতি না পেলেও রাজধানীর বাইরে কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় লাশ দাফনে প্রশাসনের অনুমতি পেয়েছে। এ পর্যন্ত তারা কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নেত্রকোনায় কয়েকটি লাশ দাফনও করেছে।

ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশনের প্রচার সম্পাদক মাওলানা এহসান সিরাজ বলেন, আলোচিত পুলিশ উপপরিদর্শক সুলতান আরেফিনের দাফনের কাজ সম্পন্ন করে ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশন জামালপুর জেলা টিম।

বর্তমানে রমজান উপলক্ষে তিন দফা জরুরি খাদ্যসামগ্রী ও দুই দফা নগদ অর্থ বিতরণ করেছে এ সংগঠনটি। ঈদ উপহার প্যাকেটসামগ্রী তহবিল গঠন করছেন তারা।

এ ছাড়া চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সারা দেশে লাশ দাফনের জন্য বিশেষ টিম গঠন করেছে এবং এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ও করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ৩৫ জনের লাশ দাফন করেছে।

করোনা সংকট শুরু হওয়ার পর নিজ সন্তান যখন মা-বাবার লাশ ফেলে পালিয়ে যায়, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সারা দেশে তরুণ আলেমরা মানবতার কল্যাণে নেমে পড়েছেন। তাদের অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।

লেখক: তরুণ আলেম ও গণমাধ্যমকর্মী

tanjilamir95@gmail.com


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।