১৭, আগস্ট, ২০১৯, শনিবার | | ১৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

পত্রিকায় পুরোটা যেন প্রকাশিত না হয়

প্রকাশিত: ১২:০৯ অপরাহ্ণ , জুলাই ১৬, ২০১৯

পত্রিকায় পুরোটা যেন প্রকাশিত না হয়

খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সেনাশাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিশেষ আদালতে বিচার হয়। এরশাদ নিজের হাতে লেখা একটি বিবৃতি বা জবানবন্দি আদালতে পাঠ করেছিলেন। পাঠ করার আগে তিনি বিজ্ঞ বিচারককে অনুরোধ করেন, সেটি যেন পত্রিকায় পুরোটা প্রকাশিত না হয়। রিপোর্ট করার জন্য শুধু একটি কপি দিয়েছিলেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সৈয়দ মোজাম্মেল হককে। ওই জবানবন্দির একেবারে শুরুতেই তিনি বলেছিলেন, ‘উনিশ শ বিরাশি সনের চব্বিশে মার্চ যেদিন আমি দায়িত্ব গ্রহণ করি, তার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না।’

জেনারেলের এই সরল স্বীকারোক্তির পরে কেন তিনি রাষ্ট্রের দায়িত্বভার নিজের কাঁধে তুলে নিলেন, তার সপক্ষে যত অজুহাত ও কারণই দেখান না কেন, তার দুপয়সা দাম নেই। দেশে একটি নির্বাচিত সরকার ছিল, কার্যকর পার্লামেন্ট ছিল, তার পরেও যদি রাষ্ট্র রসাতলে যেত তো যেত, রাজনৈতিক নেতারা ও দেশের মানুষ সমস্যা সমাধানে যা করার তা-ই করতেন। দেশপ্রেমিক হলে তিনি সরকারকে না হটিয়ে সেনাপ্রধান হিসেবে সহযোগিতা করতে পারতেন। যদিও দেশে তখন আন্দোলন-বিক্ষোভ তেমন কিছুই হচ্ছিল না।

সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর পর বাংলাদেশে ছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার। মন্ত্রীদের জবাবদিহি ছিল রাষ্ট্রপতির কাছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে নয়। রাষ্ট্রপতির জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরে কোনো সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়নি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ সব প্রধান দল অংশগ্রহণ করেছিল।
রাষ্ট্রপতি সাত্তারের ছিল দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, তিনি শেরেবাংলা ফজলুল হকের সরকারে কাজ করেছেন তিরিশের দশকে। অবিভক্ত বাংলায় তিনি কলকাতা করপোরেশনে চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে ছিলেন পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয়

সরকারের স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষামন্ত্রী, ঢাকা হাইকোর্ট ও পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, পাকিস্তানের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তাঁর পরিচালিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৭০-এ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সাত্তার কতগুলো বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেন। বঙ্গবন্ধুর পরে তাঁর সরকারই ছিল বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচিত বেসামরিক সরকার। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। বয়স হয়েছিল প্রায় ৮০। তিনি হয়তো ভেবে থাকবেন বয়সের কারণে তাঁর পাঁচ বছর মেয়াদ পূরণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। ধারণা করি, তিনি চেয়েছিলেন মৃত্যুর আগে কিছু জনকল্যাণমূলক কাজ করে যাবেন।

তাঁর মন্ত্রিপরিষদের দুর্নীতিপরায়ণদের বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাতে দলের নেতাদের বিরাগভাজন হন। ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২, রাষ্ট্রপতি সাত্তার দুর্নীতিমুক্ত সরকার গঠনের লক্ষ্যে তাঁর মন্ত্রিসভা বাতিল করে পরদিন মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করেন। তাতে বিএনপিতে অসন্তোষ দেখা দেয়। যুবদল, শ্রমিক দল, ছাত্রদলের নেতাদের তাঁর কাছে ঘেঁষতে দিতেন না। তাঁর সরকারের সচিবদের প্রায় সবাই ছিলেন সাবেক সিএসপি কর্মকর্তা। তাঁরা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ। তাঁদের কাছেই শুনেছি, সাত্তার ফাইলে তাঁদের নোটের প্রতিটি শব্দ দেখে হয় সই করতেন, নয়তো ফেরত দিয়ে বলতেন নতুন করে লিখে আনতে। প্রেসিডেন্টের কড়াকড়িতে বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ আমলাদের মধ্যে অব্যক্ত অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। জিয়াউর রহমানের সময় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সিবিএ নেতারা মাথায় উঠেছিলেন। তিনি তাঁদের অন্যায্য দাবিদাওয়ার প্রশ্নে কঠোর হন। শত শত ধর্মঘটি ব্যাংক কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেন। সশস্ত্র বাহিনী যাতে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে, সে উদ্যোগ নেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এরশাদ বেঁকে বসেন। তিনি নজিরবিহীনভাবে একটি ১২ দফা দাবি খাড়া করেন। শাসনক্ষমতায় সেনাবাহিনীর অংশীদারত্ব চান। খোলাখুলিভাবে পত্রিকায় বিবৃতি দিতে থাকেন। সরকারি দলের ক্ষুব্ধ অংশের মদদ পান এবং বিরোধী দলের নেতাদের থেকে পান উৎসাহ। বিচারপতি সাত্তারকে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন।

এরশাদ আট বছর দেশের ভাগ্যবিধাতা ছিলেন। ৮৯ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হলো। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিয়োজিত ছিলেন। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার কদাচিৎ করে থাকবেন। কিন্তু তাঁর শাসনের পুরো সময়টা দেশ ছিল উত্তাল। রক্ত ঝরেছে রাজপথে। ট্রাক উঠে গেছে মিছিলের ওপর। অগণিত মায়ের বুক খালি হয়েছে। তার বাইরে যা হয়েছে তা হলো বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রটাই বদলে গেছে তাঁর শাসনামলে। তিনি রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচন করেছেন। তাতে বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের অংশগ্রহণ করিয়েছেন। ফ্রিডম পার্টিকে সংসদে এনেছেন। তারা বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে রাষ্ট্রবিরোধী ভাষণ দিয়েছে। তাদের মুখপত্র দৈনিক মিল্লাতকে সহযোগিতা করেছেন।

এরশাদ ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাবাদী বা পাকিস্তানবাদী। একাত্তরের এপ্রিলে তিনি পাকিস্তান থেকে দেশে এসে আবার ফিরে যান। সেখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সেনাসদস্যদের বিচারকাজ পরিচালনা করেন। তাঁর সময়ে ইসলামি মৌলবাদের উত্থান ঘটে, নব্বইয়ের দশকে যা দানবে পরিণত হয়। কারও দাবি না থাকা সত্ত্বেও তিনি সরকারি ছুটি রোববার থেকে শুক্রবার করেন। তাতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে বড় যে সর্বনাশটি তিনি করে গেছেন তা হলো রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করা। তাতে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের এক বিন্দু উপকার হয়নি, কিন্তু অমুসলিম নাগরিকদের মনে গভীরতম আঘাত লেগেছে। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের চরিত্রে কলঙ্ক লেগেছে।

জেনারেল এরশাদ বিচিত্রভাবে জাতিকে ধোঁকা দিয়েছেন। ঐক্যবদ্ধ জাতির মধ্যে তিনি বিভক্তি সৃষ্টি করেছেন। হঠাৎ তিনি কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর লেখা বলে কথিত কবিতা ও গান ধ্বনিত হতে থাকে বাংলার আকাশে-বাতাসে। বিদেশের কবি-সাহিত্যিকদের তিনি আমন্ত্রণ করে এনেছেন। ইংল্যান্ড থেকে এনেছেন রাজকবি টেড হিউজেসকে। ভারতের বিখ্যাত শিল্পী পরিতোষ সেনকে আমন্ত্রণ করে এনেছেন। কবিতার আসর বসিয়েছেন। তাঁর সময়েই শামসুর রাহমান দৈনিক বাংলা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এরশাদ সৈয়দ আলী আহসানকে দিয়ে তাঁর সমর্থক কবিদের সংঘ করেছেন। শামসুর রাহমানের নেতৃত্বে আমাদের মতো অভাজনেরা কবিতা পরিষদ গঠন করতে বাধ্য হয়েছে।

জেনারেল এরশাদ অনেক সংস্কারমূলক কাজও করেছেন। উপজেলা পরিষদ করেছেন। তাঁর সময়ের সবচেয়ে প্রশংসার কাজ ঔষধনীতি ও স্বাস্থ্যনীতি। অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতি করে জাতিকে পিছিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সময়ে ব্যাংক ঋণখেলাপি সংস্কৃতির শুরু। আজ তা গিনেস বুকে ওঠার অবস্থায়। তাঁর আমল থেকেই শুরু হয় রাতারাতি বড়লোক হওয়া। মুজিবনগর কমপ্লেক্স, শহীদ মিনার সংস্কার তাঁর সময়ে। তিনি ঢাকার বানান পরিবর্তন করেন, ভালো কাজ।

যেহেতু স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে সব দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন, সুতরাং ভালোমন্দ সব দায় তাঁকেই বহন করতে হবে। কিন্তু তিনি তো একা ছিলেন না। আত্মপ্রবঞ্চনায় বাঙালি অদ্বিতীয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক তাঁর থেকে ব্যাপক সুবিধা নিয়েছেন। পদ পেয়েছেন, রাজউকের প্লট নিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে বিশ্বভ্রমণ করেছেন, পাঁচতারা হোটেলে থেকেছেন, তাঁর জানাজায় তাঁরা যদি না-ও গিয়ে থাকেন, একবার আয়নার সামনে দাঁড়াবেন না?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক

উৎস : প্রথম আলো।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।