২৪, আগস্ট, ২০১৯, শনিবার | | ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

গ্রামে ‘দরবেশ’, শহরে চোর!

প্রকাশিত: ১০:১২ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ২৪, ২০১৯

গ্রামে ‘দরবেশ’, শহরে চোর!

চট্টগ্রামের চন্দনাইশের পূর্ব ধোপাছড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. বদরুল হক নাসির (৪২)। স্থান-কালভেদে তার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়। চট্টগ্রাম বন্দরে তার পরিচয় ‘বন্দর শ্রমিক’, নোয়াখালীর সেনবাগে ‘দানবীর’, রাজধানীর মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে নিয়মিত জুয়াড়ি আর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাছে তার পরিচয় এক ভয়ংকর চোর হিসেবে। গত রবিবার রাতে রাজধানীর বংশাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এই নাসিরসহ তার চার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলো মফিজুর রহমান (৩৬), রাহাত সরকার (২৮), মমিনুল ইসলাম (৩০) ও জামাল (৪০)। পরদিন সোমবার তাদের আদালতের মাধ্যমে দুদিনের রিমান্ডে নিয়ে ডিবি কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে নাসিরের দীর্ঘদিনের চোর পেশার বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।

নাসির ও তার সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেওয়া একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা গতকাল মঙ্গলবার জানান, ১৫ বছর ধরে চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বহুতল ভবনের করপোরেট

অফিসগুলোতে চুরির ঘটনা ঘটিয়ে নির্বিঘে পালিয়ে যায় নাসির। দীর্ঘ এই সময়ে প্রায় ২০০ প্রতিষ্ঠানে চুরি করলেও কখনই তাকে ধরতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চুরির টাকার একটি অংশ দিয়ে শ্বশুরবাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগের খাজুরিয়া গ্রামের দুস্থ মানুষদের সহায়তা করেছে। এ কারণে সেখানে দানবীর হিসেবে পরিচিত নাসির। আবার রাজধানীর মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে একজন নিয়মিত জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত।

ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে নাসির জানায়, ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করে সে। সেখানে জাহাঙ্গীর নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে বন্দরের কন্টেইনারের মালামাল চুরির মাধ্যমে চুরির পেশায় হাতেখড়ি হয়। এরপর ধীরে ধীরে ডিজিটাল লক ও ভল্ট ভাঙার কৌশল রপ্ত করে। পরে বন্দরের কাজ ছেড়ে দিয়ে গুরু-শিষ্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভবনে চুরি শুরু করে। একপর্যায়ে গুরু জাহাঙ্গীর মারা গেলে রাজধানী ঢাকায় চলে আসে। চুরির জন্য গড়ে তোলে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। দলের সদস্য হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সোনার বাংলা ট্রেনের টিটি মমিনুল ইসলাম, উবারচালক মফিজুর রহমান এবং কাপড়ের দোকানি রাহাত সরকারকে দলে ভেড়ায়। তাদের নিয়ে একের পর এক রাজধানীর বিভিন্ন বহুতল ভবনে নিত্যনতুন কৌশলে চুরি করতে থাকে। ভবনের ডিজিটাল লক, সিকিউরিটি সিস্টেমের সার্ভার অকার্যকর এবং ভল্ট ভেঙে লাখ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে যায় তারা।

ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার এক অতিরিক্ত উপকমিশনার বলেন, ‘২০০৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম এবং রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা মিলে নাসির ২০০ চুরির কথা স্বীকার করেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে আরও বেশি চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি।’

ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার বদরুজ্জামান জিল্লু বলেন, ‘রাজধানীর পান্থপথ, বাংলামোটর ও উত্তরা এলাকার বিভিন্ন বহুতল ভবনে বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে চুরির ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে এই চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। তারা চুরি করার আগে দলের সদস্য উবারচালক তার গাড়ি নিয়ে একাধিকবার রেকি করত। এরপর অন্য সহযোগীরা ভবনের ভেতরে পর্যবেক্ষণ করত। তারপর তারা চুরির দিনক্ষণ ঠিক করে চুরির অপারেশনে নামত।’ এই ডিবি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘চুরির সময় নাসিরের সহযোগী হিসেবে তালা ভাঙার বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ব্যাগ নিয়ে পাশেই থাকত ট্রেনের টিটি মমিনুল। সাধারণত ট্রেনে একটানা দুই সপ্তাহ ডিউটি করত, পরের দুই সপ্তাহের ছুটির সময় চুরির কাজে সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করত সে। আর ট্রেনে ডিউটি পালনকালে চুরির কাজে বদলি হিসেবে তার দূরসম্পর্কের এক ভাতিজাকে নিয়োগ দিত।’

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, নাসিরের দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী থাকেন চট্টগ্রামে আর দ্বিতীয় স্ত্রী নোয়াখালীর সেনবাগে। চুরির টাকা দিয়েই সে দুই সংসারের খরচ চালাত। এছাড়া চুরির টাকা দিয়ে জুয়া খেলার পাশাপাশি শ্বশুরবাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগের খাজুরিয়া গ্রামের গরিব মানুষদের দান করত। যেকোনো চুরির অপারেশন সম্পন্ন করেই খাজুরিয়া গ্রামে চলে যেত নাসির। সেখানে গিয়ে সবসময় টুপি পরে থেকে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। দান করত মসজিদ-মাদ্রাসায়। এছাড়া গ্রামের গরিব মানুষ থেকে শুরু করে যেকোনো বিপদগ্রস্ত মানুষকে আর্থিক সহায়তা দিত। শ্বশুরবাড়ির গ্রামের মানুষ জানত, নাসির ভারত থেকে পাথর আমদানি করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে থাকে। সেই ব্যবসা থেকেই তার কোটি কোটি টাকা আয় হয়। এই টাকা দিয়েই গরিব মানুষকে সহায়তা করে। এসব মিলিয়ে গ্রামে দানবীর হিসেবে পরিচিতি পায় নাসির।

ডিবির আরেক কর্মকর্তা জানান, এনা গ্রুপের ভবনে চুরির সময় পুরো রাত সময় লেগেছিল নাসির ও তার সহযোগীদের। সেদিন এক রাতে তারা ১৪৩টি ড্রয়ার খুলেছিল। চুরি করেছিল প্রায় ২২ লাখ টাকা। এছাড়া গত ২০ মে নাসির ও তার সহযোগীরা চুরি করেছিল উত্তরার উইনটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড কোম্পানিতে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. মেহেরুল ইসলাম জানান, একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি বিকেল সোয়া ৪টার দিকে এবং আরেকজন ব্যাগ হাতে সাড়ে ৪টার দিকে রেজিস্ট্রারে এন্ট্রি করে তাদের উত্তরার অফিস ভবনে ঢুকে। পরে ওই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে দুটি ব্যাগ হাতে অফিস থেকে বের হয়ে যায়। প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যে ওই অজ্ঞাত ব্যক্তিরা নবম তলার অ্যাগ্রিকালচারাল কোম্পানি লিমিটেড, অষ্টম তলার জিয়ামেন কিংল্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, ষষ্ঠ তলার উইনবিজ ডিজিটাল লিমিটেড, চতুর্থ তলার ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ফিনান্সিয়াল সার্ভিস লিমিডেটের বিভিন্ন ড্রয়ার ও ভল্ট ভেঙে টাকাসহ প্রায় ৪ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ২১ মে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন মেহেরুল। এছাড়া নাসির ও তার চক্রের সদস্যরা গত বছর ১৩ ডিসেম্বর চুরি করে বাংলামোটরের ২৮ নম্বর নাভানা জহুরা স্কয়ারের গ্রেটওয়াল সিরামিকস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অফিসে। চলতি বছরের ১২ মে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের ইউনিক হাইটসের দশম তলার প্রাইম ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কার্যালয়ে ঢুকে একই কৌশলে প্রায় ৪ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে যায়।

ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার বদরুজ্জামান জিল্লু বলেন, ‘নাসির ও তার সহযোগীরা সপ্তাহে একবার চুরি করলেও শনি ও মঙ্গলবারে চুরি করত না। কারণ হিসেবে নাসিরের ওস্তাদ জাহাঙ্গীরের নিষেধ ছিল বলে জানিয়েছে তারা। ওই দুদিন অশুভ হিসেবে বিবেচনা করত ওস্তাদ জাহাঙ্গীর। এভাবে প্রায় ১৫ বছর ধরে টানা চুরি করে গেলেও কখনো ধরা পড়েনি সে। চট্টগ্রাম বন্দরে চুরির মাধ্যমে এই চক্রের উত্থান হলেও রাজধানীতে চুরি শুরু করেছে গত তিন বছর ধরে।’

এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘চুরির সময় নাসিরের সহযোগী মমিনুল যন্ত্রপাতির ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে একজন পাহারা দেয়। আর একজন গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। নাসির কর্মকর্তা বেশে ভুয়া পরিচয়ে অফিসে ঢুকে সহযোগীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। যন্ত্রপাতি নিয়ে সহযোগী আসার পর চুরির কাজ শুরু করে সে। দ্রুত সময়ের মধ্যে চুরির মিশন শেষে সটকে পড়ে তারা।’

নাসির চুরির টাকার বড় একটি অংশ দিয়ে রাজধানীর একটি ক্লাবে গিয়ে নিয়মিত জুয়া খেলে টাকা উড়িয়েছে বলেও জানান ডিবি কর্মকর্তা বদরুজ্জামান।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।