৫, ডিসেম্বর, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ৭ রবিউস সানি ১৪৪১

হতাশায় আত্মহত্যা প্রবণতা থেকে যেভাবে বেরিয়ে এসেছিলেন এই নারী

প্রকাশিত: ৪:৩৮ অপরাহ্ণ , সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

হতাশায় আত্মহত্যা প্রবণতা থেকে যেভাবে বেরিয়ে এসেছিলেন এই নারী

ইচ্ছা ছিল মেডিকেল কলেজে পড়ার। কিন্তু পরপর দুবার ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও ব্যর্থ হন নিশাত পারভেজ নিশি। আর পাশাপাশি পারিবারিক সমস্যা তো ছিলই। সব মিলিয়েই একটা দুর্বিষহ সময় ছিল তার জন্য। “এই ব্যর্থতাটাকে আমি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না,” অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়ার সময়ই আত্মহত্যার চেষ্টা করেন নিশি। একটি ভালবাসার সম্পর্কেও জড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানেও “আসলে সেভাবে সাপোর্ট” পাননি।

“সব মিলিয়ে আমার উপর আসলে এতো বেশি চাপ সৃষ্টি করেছিল যেটার কারণে আমি আত্মহত্যা করতে উদ্বুদ্ধ হই।” আর আত্মহত্যার চেষ্টার মত ভয়াবহ একটি অভিজ্ঞতার পরও সেখান থেকে বের হয়ে এসে বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন তিনি। এখন মিজ. নিশি মনে করেন, তার সেসময়ের আত্মহত্যার সিদ্ধান্তটি আসলে বোকামি ছিল।

বাংলাদেশের সরকারি হিসাব বলছে, দেশে গড়ে প্রতি দিন প্রায় ৩০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। বছর শেষে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১১ হাজারে। বাংলাদেশ পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্রবণতা আছে এমন লোকের সংখ্যা প্রায় ৬৫ লাখ। তবে কোন ধরণের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেলে এক জন মানুষ প্রাণ নাশের মতো সিদ্ধান্ত নেন, সে নিয়ে রয়েছে নানা ধরণের মতামত ও অভিজ্ঞতা।

কারণ আত্মহত্যার প্রবণতা এমন একটি সমস্যা যা মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত।
‘কারো কাছ থেকে কোন পরামর্শ পাইনি’
সাংবাদিকতার শিক্ষক মিজ. নিশি এখন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন।

ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা থেকে কীভাবে বের হয়ে এলেন তা নিয়ে জানালেন। “আসলে নিজের চেষ্টাতেই বের হয়ে আসি।” এ বিষয়ে কারো কাছ থেকে কোন ধরণের পরামর্শ পাননি বলেও জানান তিনি। এমনকি নিজের আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনাটি অনেক দিন পর্যন্ত অন্য সবার কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন তিনি। আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে নিজের অনেক অভ্যাস পরিবর্তন করেন তিনি। শুরু করেন বিভিন্ন ধরণের বই পড়তে। বন্ধু-বান্ধবদের সাথেও নতুন করে মিশতে শুরু করেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের চলচ্চিত্র দেখাটাও এ বিষয়ে তাকে সহায়তা করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমার কাছে মনে হয়েছিলো আমি যেহেতু দ্বিতীয়বার আমার জীবনটাকে ফিরে পেয়েছি, তাই যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রাকৃতিকভাবে আমার জীবন যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই জীবন যুদ্ধ অক্ষুণ্ণ রাখবো।” নিশাত পারভেজ নিশি বলেন, “আমার সেলফ মোটিভেশনই আমাকে সেই আত্মহত্যার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলো।”

আত্মহত্যার প্রবণতা বিষয়ে সচেতনতা কেমন?

বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার প্রবণতার বিষয়টি সামনে আসে না বলে মন্তব্য করেন মিজ. নিশি। তার মতে, বাংলাদেশে আত্মহত্যার সে সব ঘটনাই পত্র-পত্রিকা আর গণমাধ্যমে আসে যেগুলোতে আত্মহত্যার ঘটনা সফল হয়। “কিন্তু যেগুলো সফল হয় না বা অনেকেই রয়েছেন যাদের মধ্যে এ ধরণের প্রবণতা রয়েছে তাদের সংখ্যা বা হিসেবটা আড়ালেই রয়ে যায়।” আর এর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতনতার অভাবকেই দায়ী করেন তিনি।

তিনি মনে করেন, নিজের আত্মহত্যা চেষ্টার বিষয়টি তিনি সবার সামনে উপস্থাপন করেছেন বিধায় তার কাছে এ বিষয়ে কথা বলতে তার অনেক শিক্ষার্থী বা আশপাশের মানুষজন আসেন। কিন্তু বেশিরভাগ ঘটনাই আসলে চাপা পড়ে যায়।

মানসিক সেবার কতটা সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে?

মিজ. নিশি বলেন, এ পর্যন্ত আত্মহত্যা প্রবণ অনেকের সাথে কথা বলেছেন তিনি। যাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন যে, বাংলাদেশে আসলে এ বিষয়ে পরামর্শ বা চিকিৎসার সুযোগ খুবই অপ্রতুল। “এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এ ধরণের কাউন্সিলিংয়ের সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে।” এছাড়া মানসিক সেবার ধরণ ভিন্ন ভিন্ন হলেও, বাংলাদেশে প্রায় সবাইকে বিভিন্ন ধরণের মানসিক সমস্যায় একই ধরণের সেবা দেয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, “মানসিক সেবা দিতে যে কাউন্সিলর, সাইকোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিস্টরা কাজ করেন, তারা অনেকটা জেনারেলভাবে অর্থাৎ সবাইকে একই ধরণের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। যেটা আসলে খুব বেশি সহায়ক হয় না।”

মানসিক সমস্যা কি আগে থেকে শনাক্ত করা সম্ভব?

মানসিক সমস্যা বেশ জটিল বিধায় অভিজ্ঞ না হলে এ ধরণের সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে বোঝা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন নিশাত পারভেজ নিশি। তিনি বলেন, মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এধরণের কাউকে বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেলে হয়তো তিনি বুঝতে পারবেন। এছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। এছাড়া বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে, বাবা-মায়েরাও সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তেমন সচেতন থাকে না বলে তিনি মনে করেন। “আমাদের বাবা-মায়েরা আসলে আমাদেরকে একটা প্রেশার কুকারের মধ্যে রাখেন। তাদের পছন্দের জীবন কাটাতে বাধ্য করেন,” তিনি বলেন। তার মতে, বাবা-মায়েরা সন্তানের মনের অবস্থা সহজে বুঝতে পারে না বলে তরুণরা মূলত বন্ধু-বান্ধবদের কাছে বলে থাকে। কিন্তু সেটাও আসলে ফলপ্রসূ হয় না। “আমাদের মানসিক সেবা বা মেন্টাল হেলথের প্রতি আমাদের দেশে আসলে কখনোই জোর দেয়া হয় না। এটা একটা বড় ধরণের সমস্যা,” তিনি বলেন।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।