১৯, অক্টোবর, ২০১৯, শনিবার | | ১৯ সফর ১৪৪১

ধূমপানমুক্ত সমাজ গড়তে শফিক নামে এক পুলিশ সদস্যের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ!

প্রকাশিত: ১০:৩৬ অপরাহ্ণ , সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯

ধূমপানমুক্ত সমাজ গড়তে শফিক নামে এক পুলিশ সদস্যের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ!

বিশেষ প্রতিবেদক, সিএনআই: নাম মো. শফিকুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি ঢাকার বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন। পুলিশ বাহিনীতে চাকরির পাশাপাশি তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তার সেই কার্যক্রম। সেই কাজকে তিনি বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে দিতে চান। সেই লক্ষ্যে দিনরাত কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন তার এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তার এই কার্যক্রম এখন সারা বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পরেছে।

ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো নিজে অনুধাবন করতে পেরে অন্য মানুষকেও ধূমপান থেকে বিরত রাখবেন বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন। এরপর কলেজ ছেড়ে ১৯৯৬ সালে একজন কনস্টেবল হিসেবে যোগদান করেছিলেন পুলিশে। ১৯৯৮ সালে কর্মজীবনে ধূমপান নিয়ে আরও একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা হয় শফিকুল ইসলামের। মনের মধ্যে লুকানো ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নটা নীরবেই রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু ২০০৩ সালে ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নটার আত্মপ্রকাশ ঘটিয়ে শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু করেন ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলন।

নিজের দায়িত্ব পালন শেষে যে অবসর সময়টুকু তিনি পেতেন, সেই সময়েই রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ফুটপাতের দোকানদারসহ নিম্ন আয়ের নানা পেশাজীবি মানুষদের দাড়ে দাড়ে গিয়ে ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে সচেতনতা সৃষ্টি করতে আলোচনা করতেন। এমনকি ডিউটিরত অবস্থাতেও সুযোগ পেলেই ধূমপায়ী মানুষের কাছে গিয়ে তাদের নানাভাবে বোঝাতেন তিনি। শফিকুল ইসলামের এমন ব্যতিক্রম কার্যক্রমে প্রথম দিকে অনেকে তাকে পাগল পুলিশ বলত। কিন্তু ধীরে ধীরে তার সচেতনতামূলক এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে।


আন্দোলনের যখন থেকে শুরু:
ধূমপানমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে ২০০৩ সনে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু করেন ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলন। সে সময়ে রিকশা ও ভ্যানচালক থেকে শুরু করে ফুটপাতের দোকানদারসহ নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে আন্দোলন শুরু করে তার এই সংগঠন।

বিস্তৃতি লাভ : সচেতনতামূলক এ আন্দোলন ধিরে ধিরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে রাজাধানীর অলিগলিসহ বিভিন্ন জায়গায় । আর ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকেন বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ। ২৯১ জন বিসিএস কর্মকর্তা এ সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন থানা, উপজেলা এবং জেলায়। ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এমনকি বিভিন্ন অফিস আদালতেও।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলন: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অগ্রগতিতে শফিকের এ আন্দোলন যুক্ত হয় ফেসবুকে। তৈরি করা হয় ফেসবুক গ্রুপ নামক প্লাট ফরম । ২০১৪ সাল থেকে ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে প্রচারণা চলতে থাকে। ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলনের সদস্য সংখ্যা এখন ২৮ হাজার। ফলোয়ার প্রায় দুই কোটি। শফিকুল ইসলাম প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে পেজের মূল অ্যাডমিন। এছাড়াও ৯ জনের মত অ্যাডমিন রয়েছেন।

সংগঠনের কার্যক্রম: ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই সংগঠনের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে- পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চায়ের দোকানে সভা-সেমিনার। এছাড়া দেশের সকল উপজেলা, থানা ও জেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা মানুষকে সচেতন করার জন্য কাজ করছেন। এ ক্ষেত্রে কারো ওপর বলপ্রয়োগ করা হয় না। এমনকি সদস্যদের মধ্যে কেউ ধূমপান করেন কি-না? তার জন্যও রয়েছে মনিটরিং সেল। সদস্যদের মধ্যে কেউ ধূমপান করলে তার সদস্যপদ বাতিল করা হয়। এপর্যন্ত ২০০শ’রও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তারা সচেতনতামূলক সেমিনার, সভা ও আলোচনা সভা করেছে।

দেশের বাইরে এ আন্দোলন: শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই এ আন্দোলন। তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বাইরেও। সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান ও ফিনল্যান্ডসহ বেশকিছু দেশে চলছে এ সংগঠনের বিশাল কার্যক্রম।


উৎসাহ: তিনি জানান, প্রায়ই এই সংগঠনের সাত থেকে আট জন উপদেষ্টা মিলে একটা করে ভিডিও কনফারেন্স করি। সেখানে আমরা আলোচনা করি যে, এই মাসে আমাদের কোন সদস্য কতগুলো ভালো কাজ করেছেন। সেটা যাচাই-বাছাই করে তাকে আমরা একটা সম্মাননা দিয়ে দেই। তাকে আমরা কোনো টাকা-পয়সা বা আর্থিক সুবিধা দিতে পারি না। কারণ আমরাও কারো কাছে থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা নেই না। এটা আমাদের একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। কিন্তু সবাই মিলে একটা পোস্ট বা পদ বা সম্মাননা দেওয়ার ব্যবস্থা করি। এ ছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাকে অনেক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর ৪ বেঙ্গল, ১২ বীর, ৩৯ বিজিবি, ৫৪ বিজিবি, ১৩ আনসার ব্যাটেলিয়ন ও রাঙ্গামাটি গণপূর্ত বিভাগ আর্থিকভাবে ব্যাপক সহযোগিতা করেছে।


যেভাবে উপস্থাপন করা হয় ক্ষতিকর দিকগুলো!
তিনি বলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আমরা বিভিন্ন পদ্ধতিতে বোঝানোর চেষ্টা করি। অনেকেকে বিভিন্ন যুক্তি ও কৌশল উপস্থাপন করে বোঝানোর চেষ্টা করি। আমরা মধ্যবিত্তদের বোঝাই, যদি তারা ধূমপান ছেড়ে দেয়, তবে তারা অনেক দিক থেকেই জিতে যাব। আমরা এটাকে এভাবে বলি, আমার পরিবারের মধ্য থেকে আমি যদি ধূমপান ছেড়ে দেই, তবে প্রথমে আমি হব অর্থমন্ত্রী। কারণ আমি প্রতিদিন ধূমপানের পেছনে যে ৫০ টাকা ব্যয় করি, যদি ধূমপান ছেড়ে দেই, তবে আমার ৫০ টাকা আয় থাকবে প্রতিদিন। আর দ্বিতীয়ত আমি হব একজন পরিকল্পনামন্ত্রী। কারণ আমার কাছে যখন ৫০ টাকা প্রতিদিন বেঁচে যাবে, তখন আমি একটা পরিকল্পনা করব যে এই ৫০ টাকা দিয়ে আমি কী করতে পারি। জামা কিনব না জুতা কিনব, নাকি আমার বাচ্চার দুধ কিনব ইত্যাদি। আর তৃতীয় আমি হব একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কারণ আমি আমার এবং আমার পরিবারের মানুষের সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছি। এই থিউরিটা নিয়ে আমি বেশ কিছু এলাকায় প্রোগ্রাম করেছি। আমি ইউআইইউ ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ২০ জন ছাত্র নিয়ে এবং শিক্ষকদের সাথে সেমিনার করেছি।

প্রতিবন্ধকতা: এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি তাকে লোভনীয় প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। কখনো কখনো ভয়-ভীতি দেখানো হয়েছে। তারপরও থেমে যায়নি তাদের এ জনমুখি আন্দোলন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: আন্দোলন বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সবাই আমাকে দারুণভাবে সাহায্য করছে।আমাদের দেশসহ বাইরের দেশে ধূমপানমুক্ত করতে আজীবন কাজ করে যাবো। সবাই যার যার অবস্থান থেকে একই প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে পারেন। ফেসবুকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ আন্দোলনে যে কেউ শরিক হতে পারেন।’

শফিকের পরিচয়: মো. শফিকুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার কাদৈর গ্রামে এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা তোফাজ্জল হোসেন ও মা মহারানী বেগমের সন্তান তিনি। বাবা-মা পৃথিবীতে নেই। দুই ভাই-তিন বোনের মধ্যে তৃতীয় তিনি। চাকরির পাশাপাশি রাজধানীর সরকারি কবি নজরুল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ নামের এই সচেতনতামূলক আন্দোলনকে থমকে দিতে বেশ কয়েকটি সিগারেট কোম্পানি বহুবার নানাভাবে বাধা দিয়েছিল এবং হয়রানি করার চেষ্টা করেছিল। আর শুধু বাধাই নয়, একসময় পুলিশের এই এসআইকে বড় অংকের টাকার অফারও করা হয়েছিল আন্দোলনটি বন্ধ করতে। ব্যতিক্রমী এই মানুষটি নানা রকমের প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই এই আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।



সিএনআই/এইচআর


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।