১৯, অক্টোবর, ২০১৯, শনিবার | | ১৯ সফর ১৪৪১

সম্প্রতি সময়ে ছাত্রলীগের নৃশংসতা!

প্রকাশিত: ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ , অক্টোবর ৯, ২০১৯

সম্প্রতি সময়ে ছাত্রলীগের নৃশংসতা!

রাজনীতি ডেস্ক: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক নৃশংস ঘটনার জন্ম দিয়েছে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ ১৯৪৮ সালে গঠিত হয়ে ৭১ বছরে দেশে নানা অর্জনের অংশীদার হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ সমালোচিত।

গত ৯ বছরে আবুবকর থেকে শুরু করে বিশ্বজিৎকে হারাতে হয়েছে প্রাণ। বাদ যায়নি এহসানের চোখ। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে হামলার অভিযোগ; দেশব্যাপী কোটা আন্দোলনের সময় হাতুড়ি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ রয়েছে। খাদিজাকে লড়তে হয়েছে মৃত্যুর সঙ্গে আর জুবায়ের ও দিয়াজ নিহত হয়েছেন।

সিট দখলের বলি আবুবকর : ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এএফ রহমান হলে সিট দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন মেধাবী ছাত্র আবুবকর। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী শক্ত ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে তার মাথা থেঁতলে দেওয়া হয়। এ হত্যার ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি মামলা হয়। ২০১৭ সালে আদালতের রায়ে ছাত্রলীগের অভিযুক্ত ১০ নেতাকর্মী সবাই বেকসুর খালাস পায়।

বিশ্বজিৎ দাস : পুরান ঢাকার একজন দর্জি ছিলেন বিশ্বজিৎ দাস। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নৃশংস হামলায় তার মৃত্যু হয়। সে সময় বিরোধী দল ১৮ দলীয় জোটের অবরোধ চলছিল। বিশ্বজিৎ শিবিরকর্মী এমন ধারণা করে তাকে চাপাতি, কিরিচ দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে কোপায় ছাত্রলীগ কর্মীরা। আলোচিত এ ঘটনায় নিম্ন আদালতে আট আসামির মৃত্যুদণ্ড হলেও চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন, দুজনকে খালাস আর পলাতক দুজনের রায় বহাল রাখে হাইকোর্ট।

নিজ দলের কর্মীকেই হত্যা : জুবায়ের আহমেদ ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। তিনি নিজেও ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। ২০১২ সালে ৮ জানুয়ারি ছাত্রলীগের মধ্যে অন্তর্কলহের জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন তিনি মারা যান।

জুবায়েরের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সময় ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জনের কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। আন্দোলনের চাপে সে সময়কার উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ ঘটনায় মামলা আপিল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। গত বছর পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত। দণ্ডপ্রাপ্তরা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন।

দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ঝুলন্ত মরদেহ : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন দিয়াজ ইরফান চৌধুরী। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই একটি ভাড়া বাসা থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।

প্রথমদিকে তাকে হত্যা করার আলামত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মেলেনি। দিয়াজের বাবার করা নতুন হত্যা মামলায় মরদেহ পুনরায় ময়নাতদন্ত করা হয়। যাতে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত পাওয়া যায়। দিয়াজের মরদেহের প্রথম ময়নাতদন্ত হয় ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর। দুদিন

পর পুলিশ জানায়, তাকে হত্যা করার  আলামত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মেলেনি। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলাকালে ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন দিয়াজের বাবা। মামলাটি এখনো সিআইডিতে তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ।

মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে খাদিজা : ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবরের ঘটনা। এমসি কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পরই খাদিজা আক্তার নার্গিসকে চাপাতি দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) ছাত্রলীগের সহসম্পাদক বদরুল আলম। নার্গিসকে মৃত ভেবে পালিয়ে যাওয়ার সময় পথচারীরা তাকে আটক করে পুলিশে দেয়। আলোচিত এ ঘটনায় বদরুলের যাবজ্জীবন সাজার রায় দিয়েছে আদালত।

হেলমেট বাহিনীর হামলা : গত বছর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় হেলমেট পরিহিত সশস্ত্র কিছু যুবক ধানম-ি, জিগাতলা ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় পুলিশের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকদের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হামলাকারীরা ছাত্রলীগের কর্মী বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পরিচয়সহ খবর বের হয়। কিন্তু এ ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার হয়নি, কারও বিচারও হয়নি।

হাতুড়িওয়ালা মামুনের বিচার হয়নি : দেশব্যাপী কোটা আন্দোলনের সময় বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ ওঠে। তেমনই একটি ঘটনা ঘটে গত বছর ২ জুলাই। তরিকুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থীকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের রাস্তায় পেটায় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। তাকে হাতুড়িপেটা করে দলটির সহসম্পাদক আবদুল্লাহ আল-মামুন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

চোখ হারিয়েছে এহসান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলে গত বছর ৬ ফেব্রুয়ারি এহসান নামে এক ছাত্রকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। নিজের ক্যালকুলেটর ফেরত চাইলে তার ওপর এ হামলা চালায় তারা। এ সময় এহসানকে শিবিরকর্মী বলেও অপবাদ দেওয়া হয়। হামলায় তার চোখের কর্নিয়া গুরুতর জখম হয়। ঘটনায় ছাত্রলীগের সাত নেতাকর্মী বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার হলেও তারা হলে থাকতেন বলে গণমাধ্যমে খবর বের হয়। অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতায় এহসান দেশ ছাড়েন।

এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে আগুন : সিলেটে ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল ২০১২ সালে। যাতে পুড়ে গিয়েছিল ছাত্রাবাসের ৪০টির বেশি কক্ষ। সেদিন ছাত্রশিবিরের কর্মীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছিল। ঘটনার পাঁচ বছর পর বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যাতে বলা হয়েছে, সংঘর্ষের জের ধরে ছাত্রলীগের কর্মীরাই অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছিল তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

সবশেষ আবরার : বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ সবশেষ গত ৬ অক্টোবর (রবিবার) গভীর রাতে ছাত্রলীগের নৃশংসতার শিকার হন। রাত ২টার দিকে শেরেবাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তড়িৎকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্রের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতারা ওইদিন সন্ধ্যায় তাকে রুম থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। আবরারের বাবা বরকতুল্লাহ ১৯ জনকে আসামি করে মামলা করেন, যার মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে ১০ জন।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।