১৬, অক্টোবর, ২০১৯, বুধবার | | ১৬ সফর ১৪৪১

নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া যায় দিনাজপুর বীরগঞ্জের সিংড়া ফরেষ্ট

প্রকাশিত: ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ , অক্টোবর ৯, ২০১৯

নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া যায় দিনাজপুর বীরগঞ্জের সিংড়া ফরেষ্ট

দিনাজপুর প্রতিনিধি: শহরের ইট সিমেন্টের আর যানজট থেকে সাময়িক শান্তির পথ খুঁজে যাওয়া যায় বনের ভিতরে এলোমেলো পথ খুঁজে পাওয়া যায় অপরুপ সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশ দিনাজপুর বীরগঞ্জের পারেন সিংড়া ফরেস্টে। রাস্তার দু ধারে শাল-সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালির সমন্বয়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সিংড়া বন। সূর্যের আলো পড়ছে তাদের গায়ে। সুনশান নিরবতা। যেন এক টুকরো সুন্দরবন। আমি বলছি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নে অবস্থিত সিংড়া বনের কথা। স্থানীয়ভাবে এই বন সিংড়া শালবন নামে পরিচিত। দিনাজপুর জেলা শহর থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার ঢাকা-পঞ্চগড় মহাসড়ক থেকে নেমে মাত্র ২কিলোমিটার উত্তরে পিচঢালা পথ আপনাকে নিয়ে যাবে সিংড়া বনের ভিতরে। বনে ঢোকার প্রবেশ মুখেই সরকারি রেস্ট হাউস। তারপর ঘুরা ঘুরি সিংড়া ফরেষ্টে কিছুক্ষনের জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলা ।

দিনাজপুর সামাজিক বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ৮৫৯.৯৩ একর জমির উপরে অবস্থান করছে এই সিংড়া শালবন। ১৮৮৫ সালে এই বনকে অধিভূক্ত করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭৪সালে বনবিভাগের অধীনে নিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। তারও পরে প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন,বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং পর‌্যটন সুবিধার উন্নয়নের জন্য ২০১০ সালের অক্টোবরে বনবিভাগ এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষনা করেন।

এই বনে মূলত পাতাঝরা শালবৃক্ষের আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু শাল ছাড়াও এখানে রয়েছে জারুল, তরুল, শিলকড়ই, শিমুল, মিনজিরি, সেগুন, গামার, আকাশমনি, ঘোড়ানিম, সোনালু, গুটিজাম, হরতকি, বয়রা, আমলকি, বেতসহ বিভিন্ন রকমের উদ্ভিদ ও লতা-গুল্ম রয়েছে। টগর, জুঁই, বনবেলী, হৈমন্তী ফুলেরও দেখা মিলবে সিংড়া শালবনে। ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে শতমূল, অনন্তমূল, গুলঞ্চ, জৈষ্ঠ্য মধু, আকন্দ, মাছ আলু। তবে ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়িয়েছে গিলালতা নামক লম্বা এক উদ্ভিদ। পুরো বনের মধ্যে এই গিলালতা গাছটি দেখে টারজানের কথা মনে পড়েনি এমন মানুষের সংখ্যা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। গিলালতার লতা যেন ঝুলে আছে পাটের রশির মত। স¤প্রতি এই গাছে ঝুলতে দেখা যায় কৃষ্ণচূড়া কিংবা হাইব্রিড সীমের মত লম্বা লম্বা ফলের। বনবিভাগ ইতোমধ্যে গাছটির চারপাশে প্রায় ১কাঠা জমি জুড়ে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে। গহীন বনের পথ মাড়িয়ে তবুও দর্শক একবার দেখবার জন্য প্রতিনিয়তই ভীড় করছে গিলা লতার গোড়ায়।

বনের ঠিক মধ্যভাগে শোনা যাবে পাখির কিচির-মিচির শব্দ। যেন পাখিদের হাট বসেছে। তিলা ঘুঘু, কণ্ঠীঘুঘু, কাঠ-ঠোকরা, বুলবুলি, হাঁড়িচাচা পাখি। রয়েছে প্রকৃতির ঝাড়ুদার হিসেবে খ্যাত শকুন পাখি। শীত প্রধান এলাকা থেকে আসা এইসব শকুনের জন্য বনবিভাগ বাঁশ দিয়ে একটি ঘর নির্মান করেছে। বিপদগ্রস্থ শকুনদের সেখানে পূনর্বাসনের মাধ্যমে সেবা দেয়া হচ্ছে। শীত শেষ হবার সাথেই সেই শকুনগুলোকে আবার অবমুক্ত করা হয়। পাখি ছাড়াও মাঝে মাঝে দেখা মিলে খরগোশ, শেয়াল, সাপ, বেজিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখিও পতঙ্গ।

সিংড়া বনের সৌন্দর‌্য শতগুনে বৃদ্ধি করেছে বনের ভিতর দিয়ে বয়ে চলা নর্ত নদী। ঠাকুরগাঁও জেলার টাঙ্গন নদী হতে উৎপত্তি লাভ করে সিংড়া বনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বীরগঞ্জে ঢেপা নদীতে গিয়ে মিশেছে। শুকনো মৌসুমে তেমন পানি না থাকলেও ভরা বর্ষায় নর্ত নদী যেন খুঁজে পায় তার নর্তকী। বনের অন্যপ্রান্তে যেতে সেই নর্ত নদীর উপরে চোখে পড়বে ছোট একখানা সেঁতু। সেঁতুর উপরে দাঁড়াতেই দুইপাশে নদীর স্বচ্ছ জল যেন মুগ্ধ করে চলেছে দর্শনার্থীদের।

বনের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত মূল রাস্তার প্রায় শেষ প্রান্তে দেখা মিলবে ছোট ছোট মাটির ঘর। জগতের সকল ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে প্রায় ৬০-৭০টি আদিবাসী পরিবার বসবাস করছে এখানে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই সাঁওতাল। বনের গাছপালা লতাগুল্ম আর শেয়াল বেজির সাথে যেন তাদের গভীর মিতালী। এখনো সিংড়া বন থেকে বেশ কিছু খাদ্য উপাদান তারা সংগ্রহ করে। বনবিভাগ ইতোমধ্যে বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটি গঠন করেছে সেখানে। সেই কমিটিতে আদিবাসীদের নিয়ে ৯টি বনরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।