১৭, নভেম্বর, ২০১৯, রোববার | | ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

রংপুরের ১০ বছরে ৩২৬ কিশোরী আলোর ভুবনে

প্রকাশিত: ৬:৪৬ অপরাহ্ণ , অক্টোবর ১৫, ২০১৯

রংপুরের ১০ বছরে ৩২৬ কিশোরী আলোর ভুবনে

রংপুর প্রতিনিধি: রংপুর বিভাগের বিভিন্ন গ্রামে এখনো বাল্য বিয়ের কারনে বালিকা বধূদের ঘর ভেঙ্গেছে বিয়ের বয়স বুঝে ওঠার আগেই। এমন ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার মাজেদা, সুচিত্রা, বুলবুলি, মুনমুন আদরী, ফেরদৌসি এমন আসংখ্য নাম। নুতন করে বাঁচতে শিখতে এখন তারা আলোর ভুবনে বাসিন্দা। এমন ২১ বালিকা বধূর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প যেন এক অন্যজীবনের কাহিনী।

অদম্য এই ২১ কিশোরী আলোকিত ভূবনের সন্ধানে আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবল চেষ্টায় শুরু করেছেন পথচলা। তাদের পথ দেখাচ্ছেন আরডিআরএস পরিচালিত রংপুর নগরীর আলোর ভুবন নামে একটি সেল্টার হোমের কর্মীরা। গত ১০ বছরে এ পর্যন্ত মোট ৩২৬জন কিশোরী এখান থেকে আলোর পথে ফিরে গেছেন। তারা এখন জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে সমাজের মূল স্থানে ফিরে গেছে।এদের সবার বাড়ি রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও ময়মনসিংহের জামালপুর জেলার বিভিন্ন গ্রামে।

এমন একজন বালিকা বধূ মাজেদা বেগম (১৪) জানায়, সে ৪ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তার বাড়ি লালমনিরহাট সদরে মোঘলহাট দুরাকুঠি কলমীপাড়া গ্রামে। বাবা মানিক মিয়া ঢাকায় জাহাজে শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। মা জামিরন বেগমও থাকেন ঢাকায়। তারা ভাই বোন থাকেন গ্রামে এক চাচার বাড়িতে। তার যখন বিয়ে, ঘর সংসার, স্বামী স্ত্রী এ সব বোঝার বয়স হয়নি তখনি স্থানীয় দুরাকুঠি উ”চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় প্রতিবেশী এক চাচার মাধ্যমে বিয়ে ঠিক হয়, লালমনিরহাট শহরের ডালপট্রি গ্রামের ভাংড়ি ব্যবসায়ী মোস্তফা মিয়া মিলন (১৮) নামের এক কিশোরের সাথে। প্রথমে বাবা-মা রাজি না থাকলেও প্রতিবেশী ওই চাচা বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে তাদের রাজি করেন। পরে ২০১৮ সালে ওই ছেলের সাথে বিয়ে হয়।বিবাহিত জীবন সম্পর্কে তার কোন ধারণাই ছিলো না। বিয়ের সময় নগদ ৭০ হাজার টাকাসহ আসবাবপত্র দেয়া হয়। বিয়ে ঠিকভাবে হলেও বিয়ের পড়েন দিনই শুরু হয় ঝামেলা। স্বামী মিলন বিয়ের পরের দিনই তাকে রাড়িতে রেখে ঢাকায় চলে যায়। তার একমাস পরেই পুনরায় তার কাছে আসে। তখন প্রতিনিয়তই কোন না কোন বিষয় নিয়ে চলতো ঝগড়া। কারণ ছোট থেকেই তার স্বামী নেশায় আসক্ত ছিলো। শুধু স্বামী নন পুরো পরিবারই নেশা দ্রব্য বিক্রি ও সেবনের সাথে জিড়ত ছিলে। এক সময় গাঁজার ব্যবসা করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরাও খেয়েছে। পরে কিশোর হওয়াতে তাকে যশোর কিশোর কারাগারে পাঠানো হয়। বেশ কিছুদিন সেখানেই ছিলেন। পরে ছাড়া পেয়ে আবারও নেশা সেবন ও বিক্রির সাথে জড়িয়ে পড়েন। এতে বাঁধা দিতে গেলেই শুরু হয় মারধোর-নির্যাতন। একপর্যায়ে স্বামীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে বাবার বাড়িতে চলে যায় ওই কিশোরী। বিয়ের ৯মাসের মাথায় পরিবারের সম্মতিতে কাজির মাধ্যমে স্বামীকে তালাক দেয়। পড়ে চলতি বছরের জুলাই মাসে রংপুরে আলোর ভূবনে আসে নতুন কওে বাঁচতে শিখতে। এখানে সে সেলাই, নকশি কাঁথা, মোমবাতি তৈরীসহ হাতের কাজের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষন নিচ্ছে। এর পর এখন থেকে ফিরে গিয়ে সে নিজে এ সব কাজ করে আর্থিক উপার্জনের পথে নামবে। ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে আবারো পড়াশুনা করার ই”ছা রয়েছে তার।

সুচিত্রা রানী রায় (১৯), তার বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার চন্দ্রখানা গ্রামে। পিতা যোগেন চন্দ্র রায় পেশায় কৃষক। যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে সে পড়াশোনা করত সেই সময় একটি বিয়ে বাড়িতে একই উপজেলার রাবাইটারি গ্রামের দুলাল চন্দ্র রায় নামের এক ছেলে সাথে পরিচয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে গড়ে উঠে প্রেমের সর্ম্পক তাদের সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। দুই পরিবারের সম্মতিতে ২০১৬ সালে তাদের বিয়ে হয়। যখন তার বিয়ে হয় তখন এসএসসি পাশ করে। স্বামী পেশা ছিলেন একটি কসমেটিকস্ কোম্পানীর সেলসম্যান।

বিয়ের পর কিছুদিন সংসার জীবন ভালো চলছিলো। তখন ফুলবাড়ি ডিগ্রী কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করে। একসাথে সংসার ও পড়াশুনা চলতে থাকে। এরই মধ্যে সংসার জীবনে শুরু হয় নানা সংকট। স্বামী ছিলেন নেশায় আসক্ত। নেশা খেয়ে তাকে মারধোর করতো। নেশা সেবনে বাধা দিলেই নেমে আসতো তার উপর নির্যাতন। দিনদিন নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। বিষয়টি পরিবারকে জানালে ঘটে আরো বিপত্তি। যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয় পরিবারের সাথে। এরই মধ্যে একটি চেলে সন্তানের জন্ম নেয়। স্বামীর নির্যাতনে মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাবার বাড়িতে ২০১৯ সালে ফিরে আসে।পড়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মাধ্যমে বিষয়টি সামাধান করা হয়। সেখান থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাশ কওে সুচিত্রা। কিš‘ এর পরও নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পরে বাধ্য হয়ে কুড়িগ্রাম আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে সে। বর্তমানে মামলা চলমান রয়েছে।এখন সুচিত্রা আলোর ভূবনে এসে সেলাই, হাতের কাজ, পুতি, মোমবাতি বানানোসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। সে জানায় একানে বর্তমানে ভালো আছে। ভবিষ্যতে পড়াশুনা করার ই”ছা রয়েছে। প্রশিক্ষণ গ্রহণের ফলে যে কাজ শিখেছি আমাকে নিজের স্বপ্ন বুননে সহায়তা করবে।

এদিকে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মাধববাটি গ্রামের দরিদ্র কৃষক আজিজুল হকের মেয়ে শারমিন আক্তার। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট। বর্তমানে তার বয়স ১৯ বছর। ২০১৪ সালে বুনিয়াতপুর সিনিয়র আলিম মাদরাসায় সপ্তম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় একই উপজেলার বিষুপুর গ্রামের হোটেল ব্যবসায়ী রেজাউল ইসলামের সাথে। পারিবারিক অভাবের কারণে তার এই বিয়ে হয়।

বিয়ের সময় নগদ দেড় লাখ টাকাসহ স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র ও একটি গরু দেয়া হয়। বিয়ের পর কিছুদিন ভালোই চললেও পরবর্তীতে শুরু হয় ঝগড়া-বিবাদ। বিয়ের পূর্বেই স্বামী নেশায় আসক্ত থাকার কারণে এই ঝগড়া-বিবাদ বাঁধে। শুরু হয় নানা ধরণে নির্যাতন। এরই মধ্যে তাদের সংসারে আসে নতুন অতিথি। জন্ম নেয় এক ছেলে সন্তান। নাম রাখা হয় সিহাব বাবু। বর্তমানে ছেলের বয়স ৩ বছর। এরই মধ্যে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে বাবার বাড়িতে চলে আসে শারমিন।

২০১৮ সালে ¯’ানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তালাক হয় তার। দুই লাখ টাকা দেন মোহর হলেও স্বামীর পরিবার তাকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেয়। তিনি মামলা করতে চাইলেও দারিদ্রতার কারণে মামলা করতে পারেননি। বর্তমানে সেল্টার হোমে প্রশিক্ষন নিয়ে হাউজ কিপিং পদে কর্মরত রয়েছে। সেখানে ৪ হাজার ৫০০ শত টাকা বেতন পান। তার ই”ছা রয়েছে গ্রামে গিয়ে অন্যদের প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে নিজেকে স্বাবলম্বী করে তোলার।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার বুলবুলি আক্তার (১৯)। ২ ভাই-বোনের মধ্যে সে বড়। গত ২০১৬ সালে  ¯’ানীয় অনন্তপুর উ”চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণীতে পড়া অব¯’ায় তার বিয়ে হয় তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বয়সে বড় আলমগীর হোসেনের সাথে। তার বাড়ি পার্শ্ববর্তী নাগেশ্বরী উপজেলার নাখারগঞ্জ গ্রামে। পেশায় ছিলেন মুদি ব্যবসায়ী। বিয়েতে সে রাজি না থাকলেও পরিবারের চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। এক বছর যেতে না যেতেই যৌতুকের জন্য শুরু হয় নির্যাতন।

ঢাকায় গিয়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে চাকুরী শুরু করে। সেখানেও নির্যাতনে শিকার হন। কারণ স্বামী মাদক সেবন ও অন্য এক নারীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলো। এর প্রতিবাদ করায় তাকে মারধোর করা সহ নানাভাবে নির্যাতন করতো। এরই মধ্যে গত কোরবানীর ঈদে বাবার বাড়িতে আসেন। তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়। পরে ২০১৮ সালে তাদের তালাক হয়। বর্তমানে সেলাই, হাতের কাজ, মোমবাতি, ঢোঙ্গা, শোপিজসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পুনরায় পড়ালেখা শুরু করেছেন। ৯ম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছেন ছিলাখানা ভোকেশনাল উ”চ বিদ্যালয় ও কলেজে। পরিকল্পনা রয়েছে আগামীতে পড়ালেখার পাশপাশি হাতের কাজ করে নিজে স্বাবলম্বী হবার। অন্যকেও দিতে চান প্রশিক্ষণ।

শুধু মাজেদা, বুলবুলি, শারমিন, সুচিত্রা নয়। তাদের মতো আরপিনা বেগম, তাছলিমা খাতুন, মৌসুমী আক্তার, বিলকিস খাতুন, আম্বিয়া খাতুন, তাছলিমা খাতুন, মোসলেমা খাতুন, মালা খাতুন, ফেরদৌসী বেগম, মুনমুন আক্তার, খালেদা আক্তার, আদুরী আক্তার, শেফালী বেগম, স্বপ্না খাতুন ও জোসনা খাতুন একই রকম ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার। যে সময় তাদের লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা সেই কিশোরী বয়সে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর সংসার টেকেনি।

স্বামীর, শাশুড়ির অত্যাচার আর যৌতুকের টাকা পরিশোধ না করতে পেরে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় হয়েছে বাবার বাড়িতে। বাবার বাড়ি ফিরে এসে বাড়ির মানুষ ও প্রতিবেশী স্বজনদের কটূক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যার চেষ্টাও চালিয়েছে। ঠিক এমন সময় বাল্য বিবাহের শিকার স্বামী পরিত্যক্তা এসব কিশোরী-তরুণীকে একত্রে করে স্বাবলম্বী হবার স্বপ্ন ও আলোর পথ দেখাচ্ছেন রংপুরের আরডিআরএস পরিচালিত আলোর ভূবন।

আলোর ভূবনের জীবন দক্ষতা প্রশিক্ষক শাকিলা বেগম জানান, সংস্থাটি তাদের নিজস্ব কর্মী বাহিনীর মাধ্যমে গ্রাম থেকে এসব কিশোরী-তরুণী স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের একত্রে করে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে ব্লক বাটিক, হস্ত কুটির শিল্প, মোমবাতি বানানো, সেলাইসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন। তাদের উদ্বুদ্ধ করছেন নিজের পায়ে কীভাবে দাঁড়ানো যায়। যদি কেউ লেখাপড়া করতে আগ্রহ দেখায় সে ক্ষেত্রে লেখাপড়ার সার্বিক সহযোগিতাও করা হচ্ছে।চাকুরীরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাল্য বিবাহের শিকার এসব ২১ কিশোরী সবাই কাজে ব্যস্ত। কেউ সেলাই, মোমবাতি বানানো, হাতের কাজসহ বিভিন্ন কাজ শিখছে।  সবার স্বপ্ন নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং আত্মনির্ভরশীল হবে। এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হলে তারা জানান, তাদের মতো আর কেউ যেন বাল্য বিবাহের শিকার না হয়।নিজেরা আত্মনির্ভরশীল না হয়ে আর বিয়ে করবেন না। এমনি যেখানে বাল্য বিয়ে হবে সেখানে তারা এর বিরুদ্ধে যাবে।

 


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।