১৪, নভেম্বর, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধার দাফন, এসিল্যান্ডকে বদলি

প্রকাশিত: ৩:৫০ অপরাহ্ণ , অক্টোবর ২৮, ২০১৯

রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধার দাফন, এসিল্যান্ডকে বদলি

সিএনআই ডেস্ক: মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করার ঘটনায় দিনাজপুর সদরের এসিল্যান্ড (সহকারী কমিশনার ভূমি) আরিফুল ইসলামকে তাৎক্ষণিকভাবে (স্ট্যান্ড রিলিজ) বদলি করা হয়েছে। সোমবার সকালে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলামকে বদলি করে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার অফিস।

এর আগে সকালে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের কবর জিয়ারত করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম। এ সময় মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নুর ইসলামকে দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরি দেয়ার ঘোষণা দেন হুইপ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রংপুর বিভাগী কমিশনার এস এম তরিকুল ইসলাম।

জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম জানান, দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম হাসপাতালে একটি জিপ গাড়ি উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে গাড়িটি হাসপাতালে চলে আসবে। ওই গাড়িটি চালাবেন মৃত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নুর ইসলাম।

এদিকে, মুক্তিযোদ্ধাকে অসম্মানের ঘটনার প্রতিবাদে সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধাকে অসম্মানের ঘটনার প্রতিবাদে দিনাজপুর সদরের এসিল্যান্ড (সহকারী কমিশনার ভূমি) আরিফুল ইসলামকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে দিনাজপুরের ডিসি, এডিসি ও সদর এসিল্যান্ডকে অবিলম্বে অপসারণের দাবি জানায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

রোববার দুপুরে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের কুলখানির অনুষ্ঠান শেষে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার সাইদুর রহমান এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলামকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে অবিলম্বে জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহফুজুল আলম ও এসিল্যান্ডকে দিনাজপুর থেকে অপসারণের দাবি জানান।

গত বৃহস্পতিবার সরকারি কর্মকর্তাদের অসম্মানের কারণে শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের দাফন সম্পন্ন করা হয়। জানাজার আগে ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের চৌকস দল গার্ড অব অনার জানাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের মরদেহ জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত করা হয়নি।

এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। শনিবার তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নুর ইসলাম। সেখানে তিনি এসিল্যান্ডের বাড়ির কাজ, রান্নার কাজ, এমনকি বাথরুম পরিষ্কার করানো হতো বলেও উল্লেখ করেন।

লিখিত অভিযোগে নুর ইসলাম উল্লেখ করেছেন, রান্না ভালো না হওয়ায় আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এমনকি সরকারি বাড়ি থেকেও বের করে দেয়া হয়েছে। বিষয়টি জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমকে জানানোর কারণে আমার বাবাকে অপমানিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক আমার বাবার সঙ্গে দেখা করেননি। এমনকি জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে জোর করে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনার পরই আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

ছেলের বিষয়টি হুইপকে জানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন চিঠিতে লিখেছেন, ‘জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে নিয়ে করা স্বাধীন দেশে আমার ছেলের রুজি রোজগারটুকু অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া হলো। গত ২১ অক্টোবর থেকে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ২নং ওয়ার্ডের ৪৪নং বেডে চিকিৎসাধীন আমি। এ অবস্থায় এই পত্রটি তোমার কাছে লিখছি। তোমার কাছে আমার আকুল আবেদন তুমি ন্যায়বিচার করো।’

মুক্তিযোদ্ধা লিখেছেন, ‘ঠুনকো অজুহাতে আমার ছেলেটিকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাকে চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করো। আমার বয়স প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি। ছেলেটি হঠাৎ চাকরিচ্যুত হওয়ায় একে তো আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ তারপর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম-স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাই না।’

২২ অক্টোবর নিজের লেখা চিঠিটিতে স্বাক্ষর করে ডাকযোগে ঢাকায় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের কাছে এ চিঠি পাঠিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন। পরদিন ২৩ অক্টোবর বেলা ১১টায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফনের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। শনিবার দুপুরে বিভাগীয় কমিশনার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. জাকির হোসেন ঘটনা তদন্তে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে যান। সেখানে চাকরির প্রস্তাব দিলে বাবার মৃত্যুর ক্ষোভে চাকরি প্রত্যাখ্যান করলেন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।