২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং, শুক্রবার
২৭শে জমাদিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

রাজশাহী আ.লীগ সভাপতির বিরুদ্ধে ৪১ নেতার ১৪ অভিযোগ

প্রকাশিত: ৮:০৫ অপরাহ্ণ , অক্টোবর ২৯, ২০১৯

রাজশাহী আ.লীগ সভাপতির বিরুদ্ধে ৪১ নেতার ১৪ অভিযোগ

রাজশাহী প্রতিনিধি: আগামী ডিসেম্বরে হতে পারে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। কিন্তু তার আগে দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বর্তমান সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী। ইতিমধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের ৪১ নেতা দলের সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এতে ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের ৭১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির পাঁচজন মারা গেছেন। বাকি ৬৬ জনের মধ্যে ৪১ জন সম্প্রতি ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে দেয়া অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ অবশ্য এতে স্বাক্ষর করেননি। তবে অভিযোগপত্রে সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্যসহ জেলা আওয়ামী লীগের পদধারী বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরাও স্বাক্ষর করেন।

নেতাদের লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৬ ডিসেম্বর সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন হয়। ২০১৫ সালের ২৭ নভেম্বর পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ হওয়ার পর ৬ ডিসেম্বর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর দলীয় সভা এবং কর্মসূচি নিয়মিতই পালন হতো। কিন্তু ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবরের পর জেলা আওয়ামী লীগের আর কোনো সভা হয়নি। ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা উপলক্ষে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীর অনুমতি নিয়ে সভা ডাকা হলেও তিনি আসেননি।

বারবার তাগাদা দেয়ার পর তিনি এ পর্যন্ত আর কোনো সভা করার অনুমতি দেননি। হঠাৎ গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি ১০-১১ জন নেতাকে নিয়ে শহরের একটি রেস্তোরাঁয় সভা করেন। এই সভা সম্পর্কে জেলা আওয়ামী লীগের অভিযোগকারী এই ৪১ নেতা অবগত নন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে ক্রমিক নম্বরসহ ১৪টি অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রটি দলের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে দিয়ে এসেছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।

ফারুকের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ হলো, তিনি জেলা আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেন না। আবার কেন্দ্রীয় কোনো কর্মসূচি পালন করা হলে তিনি এতে যোগ দিতে নেতাদের বাধা দেন। তাকে কর্মসূচির ব্যাপারে কোনো নেতা অবহিত করলে তাচ্ছিল্যের সুরে তিনি বলেন, ‘তোমাদের আওয়ামী লীগ তোমরা পালন করো’। তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, ওমর ফারুক চৌধুরী প্রথমে ছাত্রদল, বিএনপি, ফ্রিডম পার্টি করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন।

পাঁচ নম্বর অভিযোগে ৪১ নেতা বলেন, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় সারা বাংলাদেশের মানুষ যখন শোকাহত তখন ওমর ফারুক চৌধুরী তার নির্বাচনি এলাকায় ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট শোক দিবসে বিএনপির তৎকালীন উপজেলা সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান ইসাহাক আলীকে আওয়ামী লীগে যোগদান করিয়ে মিষ্টি বিতরণ উৎসব করেন। ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়, একই বছরের ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবসে ওমর ফারুক চৌধুরী তানোরের ডা. আবু বকর হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে আনন্দ র‌্যালি করেন।

সপ্তম অভিযোগে বলা হয়েছে, এমপি ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তিনি গোদাগাড়ীর মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন এবং পৃষ্ঠপোষকতা করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও তাকে মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অষ্টম অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি ৭০ ভাগ বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডারদের চাকরি দিয়েছেন। টাকা নিয়েছেন প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের নামে। লাঞ্ছিত করেছেন দলের সিনিয়র নেতাদেরও।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওমর ফারুক চৌধুরীর বাবা স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এই বিবৃতি দিয়েছে। আর ফারুক চৌধুরী তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রাব্বানীকে দলীয় সভায় যোগ দিতে বাধা দেন। তার দলের প্রতি অনীহার কারণে দীর্ঘ ২৩ মাস ধরে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে যাচ্ছে। ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে আরও শত শত অভিযোগ আছে। তাই সংগঠনের বিরুদ্ধে অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আসা অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দলীয় সভানেত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের এই ৪১ নেতা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের ৪১ জন নেতা দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে এতে আমার স্বাক্ষর নেই।’ তবে ওমর ফারুক চৌধুরী দলীয় চেতনাবিরোধী লোক উল্লেখ করে আসাদ বলেন, তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওমর ফারুক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, কমিটির কতিপয় নেতা তার সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ কেন্দ্রে করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে অভিযোগ করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, সাংগঠনিক পরিবেশ না থাকায় দলীয় কার্যালয়ে তিনি যেতে পারেননি। তবে নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি সব দলীয় ও জাতীয় কর্মসূচি পালন করে আসছেন।

গত ১৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের রাজশাহী বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ওমর ফারুক চৌধুরীকে বক্তব্য দিতে দেয়া হয়নি। দলের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক নেতাকর্মীদের সামনে এর কারণও স্পষ্ট করে যান। বলেন, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগে ‘সমস্যা’ থাকার কারণে এই সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে ঢাকায় সভা করার কথা জানান তিনি।

দলের নেতারা জানান, আগামী ৮ নভেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদকে ঢাকায় তলব করেছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। সেখানে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য শোনা হবে। এর আগেই জেলা আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতা ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিলেন দলীয় প্রধানের কাছে। আর আগামী ডিসেম্বরে যদি জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সেক্ষেত্রে এই অভিযোগ বড় প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন দলীয় নেতারা।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।