১৬, নভেম্বর, ২০১৯, শনিবার | | ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

শোকাবহ জেলহত্যা দিবস: নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড

প্রকাশিত: ৪:১০ অপরাহ্ণ , নভেম্বর ৩, ২০১৯

শোকাবহ জেলহত্যা দিবস: নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড

সিএনআই ডেস্ক: জাতির ইতিহাসে এক কলঙ্কময় দিন। আজ ৩ নভেম্বর, জেলহত্যা দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী জাতীয় চারনেতা- স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান। বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী দখলদার চক্রান্তকারী অশুভ রাজনৈতিক শক্তির প্ররোচনায় কিছু সেনাসদস্য রাষ্ট্রের সুরক্ষিত স্থান হিসেবে বিবেচিত কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় তার অবর্তমানে জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করার সুপরিকল্পিত ও সুগভীর চক্রান্তের অংশ হিসেবেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।

আজ এ দিনে আমরা জাতীয় এ চারনেতার মৃত্যুতে গভীর শোক ও তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের শোকাবহ যে দিনগুলো রক্তের অক্ষরে বিষাদের বিউগেল বাজিয়ে যায় তার মধ্যে জেলহত্যা দিবস অন্যতম। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চার ঘনিষ্ঠ সহচর স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান। বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে দুঃসহ দিনগুলো কাটাচ্ছেন তখন তার স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন এই জাতীয় চার নেতা। প্রবাসী সরকার গঠন, কূটনৈতিক তৎপরতা, সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে তারা সফল করে তুলেছেন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে।

অথচ এই নেতাদের জীবন দিতে হলো অন্তরীণ অবস্থায় স্বাধীন দেশের জেলখানায়। পৃথিবীর ইতিহাসে জেলখানার মতো নিরাপদ জায়গায় এ রকম হত্যার ঘটনা নজির নেই। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ধারাবাহিকতায় জাতীয় চার নেতাকে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে দেশকে নেতৃত্বশূন্য করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই হত্যা করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রথমে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় ভেড়ানোর চেষ্টা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। কিন্তু তারা বঙ্গবন্ধু এবং দেশের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যাতে এরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারেন সেজন্য চিরতরে তাদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে ঘাতক চক্র। সে অনুযায়ী রাতের আঁধারে জেলাখানার ভেতর তাদের হত্যা করা হয় নিষ্ঠুর পৈশাচিকতায়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে অভ্যুত্থানকারীরা তাদের কিছু সহযোগীসহ অবস্থান নেন বঙ্গভবনে। মোশতাক সরকারের ওপর তাদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। এ নিয়ে সেনাবাহিনীর একাংশের কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় অসন্তোষ। এই প্রেক্ষাপটে ২ নভেম্বর মধ্যরাতে (ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী তখন ৩ নভেম্বর) মোশতাকের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এই অভ্যুত্থানকালেই মোশতাক-রশিদ-ফারুকের প্রেরিত ঘাতক দল জেলখানায় হত্যা করে জাতীয় চার নেতাকে।

হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বিচারকাজ শুরু করে। ২৯ বছর পর ২০০৪-এর ২০ অক্টোবর অভিযুক্তদের মধ্যে পলাতক ৩ জনের ফাঁসি, জেলে অবস্থানরত ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জামিনে মুক্তদের নির্দোষ ঘোষণা করে বিচারিক আদালত একটি রায় প্রদান করে। পরে ডেথ রেফারেন্স ও রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের করা আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকে বেকসুর খালাস এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশপ্রাপ্তদের মধ্যে চারজনকে দণ্ড থেকে অব্যাহতি দেয়। এ রায় জাতিকে আরও স্তম্ভিত ও মর্মাহত করে। আত্মস্বীকৃত মূল আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যাবে এটা কারও কাছেই প্রত্যাশিত ছিল না। বিস্ময়করভাবে তখন রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করেনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রত্যাশিত আপিল দায়ের করা হয়। আপিল শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির বেঞ্চ গত বছরের ৩০ এপ্রিল রায় দেয়। হাইকোর্টের রায়টি বাতিল করে বিচারিক আদালতের রায়ই বহাল রাখে আপিল বিভাগ। জেলহত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় চারজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। এখন প্রশাসনের দায়িত্ব পলাতক দণ্ডিত আসামিদের খুঁজে বের করে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করা।

জাতীয় চার নেতার আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক এবং সামাজিক ন্যায়বিচারসম্পন্ন দেশ গড়ে তোলা। তাদের সেই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা আমাদের কর্তব্য। মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহচর জাতীয় চার নেতার সার্বিক অবদান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা আগামী তরুণ প্রজন্মকে যুগের পর যুগ অনুপ্রেরণা জোগিয়ে যাবে।

লেখক: অমিত বণিক,
কলাম লেখক, ঢাকা।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।