১৬, নভেম্বর, ২০১৯, শনিবার | | ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

পা দিয়েই স্বপ্ন জয়ের চেষ্টা আয়েশার

প্রকাশিত: ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ , নভেম্বর ৪, ২০১৯

পা দিয়েই স্বপ্ন জয়ের চেষ্টা আয়েশার

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান আয়েশা আক্তার (২৪)। এই গ্রামে ১৯৯৬ সালে জন্মগ্রহণ করে আয়শা। জন্ম থেকেই দুটি হাত নেই। হাতদুটি বাহুর কাছেই শেষ। জন্মের পর থেকে শত অপমান-অনাদর তাকে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছে। স্কুলের সহপাঠী থেকে পাড়ার খেলার সাথী সকলের কাছে আয়েশা ছিল হাসির পাত্র। তবে এই হাসি-ঠাট্টা নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু দমার পাত্রী হয়নি আয়েশা আক্তার। তাই পা দিয়ে লিখেই চালিয়ে যাচ্ছে লেখাপড়া। রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে মার্স্টাস প্রথম বর্ষে জেলার গাইবান্ধা সরকারি কলেজে পড়ালেখা করছেন। পা দিয়ে লিখে ক্লাশের পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি চাকুরি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করছে সে। অসাধারণ মানসিক শক্তি ও মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে শিক্ষাঙ্গণ থেকে কর্মজীবনে। পা দিয়ে লিখলেও ওর লেখা খুবই সুন্দর। স্বাভাবিক কোনো হাতের লেখাও এত ভালো হওয়া কঠিন।

আয়েশার বাবা আব্দুল লতিফ একজন গরিব কৃষক। মা মাজেদা বেগম গৃহিণী। আয়শারা চার বোন, ভাই নেই। বোনদের মধ্যে আয়েশা মেজো। বড় ও ছোট বোনদের বিয়ে হয়েছে। তারা সবাই স্বামীর বাড়ী। মা বাবাকে নিয়ে আয়েশার পরিবার। হাজারো স্বপ্ন তার মনে। মা মাজেদা বেগম বলেন, আয়েশা জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী। ওর জন্মের পর থেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়ি। মেয়ে হয়ে জন্মেছে তার ওপর দুটি হাত নেই। শিশুকালে হাঁটতে কিছুটা সমস্যা হলেও সাড়ে চার বছর বয়সের পর থেকে সে হাঁটতে শেখে। বড় দুই মেয়ে বাড়িতে লেখাপড়া করার সময় আয়েশা আগ্রহ নিয়ে তাদের কাছে বসে থাকত। বাড়ীর পাশ দিয়ে পাড়ার ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেতো। তা দেখে আয়শাও যেতো চাইতো। তার আগ্রহ দেখে বোনকে সঙ্গে করে বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে শুরু করে বোনরা। পরে আয়শাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করাই। এভাবেই আয়েশার পড়ালেখা শুরু।

আয়েশার বড় বোন নুরজাহান বলেন, ‘আয়েশা ২০১২ সালে কচুয়াহাট এইচ আর এম বালিকা বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৩ পেয়ে সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ২০১৪ সালে সাঘাটা উদয়ন মহিলা ডিগ্রী কলেজ থেকে জিপিএ-৩ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে। আয়েশা এই কলেজ থেকে ২০১৭ সালে জিপিএ-৩ দশমিক ৯৯ পেয়ে বিএ পাশ করে। গাইবান্ধা সরকারি কলেজে ২০১৮ মার্স্টাসে ভর্তি হয়। ৬ মাস মেয়াদী কম্পিউটার শিখেছেন তথ্য কল্যানীর কাছে। সে কয়েক প্রকারের সেলাই ও কম্পিউটারের এম এস ওয়ার্ড মোটামুটি ভাবে শেষ করেছে। তবে সে মার্স্টাসে ভর্তি হলেও বই কিনতে পারেনি অর্থ অভাবে। তিনি আরও বলেন, আয়েশার একটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড হয়েছে। সে তিন মাস পর ২ হাজার ১শ টাকা পান। এ দিয়ে পড়া লেখার খরচ যোগান সম্ভব হচ্ছেনা।

এনিয়ে আয়েশার সঙ্গে কথা হয়। সে বলে, পা দিয়ে সে শুধু লেখাই নয়, সব ধরনের কাজ করতে পারি। ঘর গোছানো, পরিষ্কার করা, রান্না করা, ল্যাপটব চালানো, মোবাইলে কথা বলা, দরজায় লাগানো তালা চাবি দিয়ে খোলা, কাপড় ভাজ করা, তরিতরকারি কাটাসহ দৈন্দদিন সব কাজ করতে পারে। সব কাজই অনায়াসে পা দিয়ে করে আসছে সে। আয়েশার ইচ্ছা, লেখাপড়া শিখে সে সরকারি চাকরি করবে। পড়ালেখা শিখে ভবিষ্যতে ভালো চাকরি করে নিজের ও পরিবারের উন্নতি করবে। সে আরও বলে, আমি প্রতিবন্ধী বলে কারো বোঝা হয়ে থাকতে চাইনা। প্রতিবন্ধীরাও মানুষ, সবার মতো তারাও সুযোগ-সুবিধা পেলে দেশের জন্য অনেক কাজ করতে পারবে। তাদেরও কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বিগত ২০১২ সালে সিঙ্গার-চ্যানেল আই সাহসিকতা পুরস্কার পেয়েছেন আয়েশা।

সাঘাটা উদয়ন মহিলা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আয়েশার লেখাপড়ার ইচ্ছা প্রবল। সে সব কিছু করতে পারে। সাধারণ মেয়ের মতই চলাচল করতে পারে। কলেজে পড়া কালিন সে ক্লাস ফাঁকি দেয়নি। লেখাপড়ায় সে অনেক ভালো। কলেজে তার একটা চাকুরি ব্যবস্থার করার চেষ্টা চলছে।

এ ব্যাপারে গাইবান্ধা জেলা সমাজসেবা কার্যালরের উপ-পরিচালক এমদাদুুল হক প্রামাণিক বলেন, বিষয়টা জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে সমাজ সেবা থেকে নিবন্ধনকৃৃত এনজিও গুলোর সাথে আলোচনা করে পড়ালেখা ও শিক্ষাবৃত্তিসহ আয়েশার কর্মের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন তিনি।


সিএনআই’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।