৪ঠা এপ্রিল, ২০২০ ইং, শনিবার
১০ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

হে ক্ষমতাবান! মাথা নত করে তাকাও আমি জনগণ ক্ষমতার মালিক

সিএনআই ডেস্ক: হে ক্ষমতাবানগণ! মাথা নত করে তাকাও, আমি জনগণ ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের মালিক। এ মালিকানা কারও করুণায় অর্জিত নয়। আমাদের (জাতির) পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন-যৌবন উজাড় করা দুঃসাহসী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সুমহান মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ শহীদের রক্ত আর মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বেদনার দীর্ঘশ্বাসে অর্জিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বাধীন বাংলাদেশে একটি উদার গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সংবিধান উপহার দিয়ে এ মালিকানা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার -পরিজনসহ নৃশংস হত্যাকান্ডের মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তে লেখা সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকেই নির্বাসিত করা হয়নি, জনগণের আকাক্সক্ষা থেকেও সরানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী সামরিক দুঃশাসন-কবলিত অন্ধকার সময়ে ও গণতন্ত্রের ভঙ্গুর যাত্রাপথে এত কাটাছেঁড়া এত সংশোধনী আনা হলেও এ মালিকানা এখনো বহাল রয়েছে। অতএব হে ক্ষমতাবানগণ! তোমাদের দাম্ভিক ঔদ্ধত্যের মাথা নত করে তাকাও। আমরা জনগণ ক্ষমতার মালিক। মাতৃভূমির জমিনজুড়ে রয়েছে লাখ লাখ শহীদের রক্ত। জাতির ঐক্যের প্রতীক বাঙালি জাতীয়তাবাদের মহান নেতা ও বিশ্বের শোষিত মানুষের নির্ভীক কণ্ঠস্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবার-পরিজন এ মাটিতে শুয়ে আছেন। এ মাটিতে শুয়ে আছেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূর্যসন্তানরা। পাকিস্তানি শাসক-গোষ্ঠীর শোষণ-বঞ্চনা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সাহসী বীর সন্তানরা। ক্ষমতাবান বলতেই কেবল সরকারকে বোঝায় না। ক্ষমতাবান বলতে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে আসা-যাওয়া করা সব রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সব প্রশাসনিক শক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্তব্যরত দায়িত্বশীলদের বোঝায়। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বোঝায়। এ লেখা যখন লিখছি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী জনবহুল কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বাস থেকে নামার পর ধর্ষিত হয়েছেন। গোটা সমাজে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে শিশু থেকে বয়স্ক নারী পর্যন্ত নিকটাত্মীয় থেকে যৌন বিকৃত কামুক পুরুষের ধর্ষণের শিকার হচ্ছে একের পর এক। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধেও ধর্ষকদের উন্মত্ততা রুখে দেওয়া যাচ্ছে না। একটি ঘটনা ঘটে দেশ প্রতিবারমুখর হয়, নিন্দার ঝড় ওঠে, তারপর আরেক ঘটনায় সেই বিদ্রোহের আগুন নিভে যায়। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীটির ধর্ষণের ঘটনায় সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ মধ্যরাতে প্রথম প্রতিবাদের মিছিল নিয়ে রাজপথে আসে। সকাল হতে না হতেই বিক্ষোভে উত্তাল হয় সব ছাত্র সংগঠন ও ছাত্রছাত্রীরা। এ রকম জনবহুল পথে বোবা দর্শকদের সামনে ধর্ষক তার অপরাধ করে যায় নির্বিঘ্নে। ধর্ষিতা কুঁকড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে উঠে আসেন বন্ধুর সহায়তায় হাসপাতালে। এই বাংলাদেশের জন্য আমাদের মহান নেতারা স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেননি। এমন ধর্ষকদের অভয়ারণ্যের জন্য এ পবিত্র মাটিকে ব্যবহার করতে লাখো শহীদ রক্ত দেয়নি। পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানে জনগণের বন্ধু হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, মুজিববর্ষে যেখানে স্লোগান উঠেছে পুলিশ হবে জনগণের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মানুষের পরম আশ্রয় বিশ্বাস ও সাহসের শক্তি হয়ে উঠে আসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গণহত্যার মুখে, বীরত্বের যুদ্ধে আমরা একে অন্যের ভাই ভাই হয়েছিলাম। তেমনি আজকের উন্নত বাংলাদেশের স্লোগান তোলা মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সব জায়গায় ক্ষমতাবানদের মনে রাখতে হবে তারা সবাই জনগণের সেবক। রাষ্ট্র জনগণের জানমাল ও ইজ্জত রক্ষার অঙ্গীকার করেছে সংবিধানে। সংবিধান গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা দিয়েছে। এখানে সরকার ও বিরোধী দলের শক্তিশালী ভূমিকা অনিবার্য। বিরোধীদের দমন করা গণতন্ত্র নয়। সবার কথা শোনাই গণতন্ত্রের ধর্ম। ক্ষমতার জোরে কখনো বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করা যায় না। মতলববাজ দালালদের উল্লাস উপভোগ করা যায়। সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ডেই গণতন্ত্রের রোদ ওঠে ঝলমল করে। একটি গণতান্ত্রিক আদর্শিক সমাজ ও শাসনব্যবস্থাই ধর্ষক-লুটেরাদের রুখতে পারে। পুরুষকে আজ মানুষ হতে হবে। ধর্ষক নয়, প্রেমিক হতে হবে। ধর্ষিতা কন্যা, বোন, স্ত্রী বা মা হতে পারেন। এটা বুঝতে হবে। রাজনীতিবিদদের প্রতিনিয়ত মনে রাখতে হবে, আমাদের রাজনীতির পূর্বপুরুষদের জনগণ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জননেতা বলে ডাকত, গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেলে রাজবন্দীর সম্মানের মুকুট পরাত। সেসব সম্মান ও মুকুট সাম্প্রতিককালের দেউলিয়া রাজনীতির গণবিরোধী প্রতিহিংসার সংস্কৃতিতে, আদর্শহীন রাজনীতির ধারাবাহিকতার যুগে হারিয়ে গেছে। সেই সম্মান, মর্যাদা ও আদর্শের পুনর্জাগরণ ঘটাতে না পারলে রাজনীতিবিদরা যেমন গণবিচ্ছিন্ন ক্ষমতাবান হতে পারবেন, মানুষের সম্মান অর্জন করতে পারবেন না তেমনি জনগণও এ রাজনীতিকে তাদের কল্যাণে নিবেদিত জননেতার হেঁটে যাওয়া আদর্শের চিত্রপটে দেখতে পাবে না। জনগণের আবেগ-অনুভূতি, আকাক্সক্ষা ও চাওয়া-পাওয়া লালনপালন না করে মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ না করলে কখনো রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না, মন্ত্রী-এমপি হওয়া যায়। হে রাজনীতিবিদগণ! হে এমপি-মন্ত্রীগণ! আমাদের পূর্বপুরুষদের সৎ-সাহসী, নির্লোভ, গণমুখী রাজনীতির আদর্শের গৌরবের রেখে যাওয়া পথের দিকে বিনয়ী হয়ে তাকাও। অগণিত মানুষের দিকে তাকাও। এ অগণিত হাড়ভাঙা পরিশ্রমী জনগণের চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা কর। মানুষের মনের যন্ত্রণা হৃদয় দিয়ে স্পর্শ করার শক্তি সঞ্চয় করে উপলব্ধি কর। মানুষের সেবা করার নামই রাজনীতি, যে রাজনীতিতে ক্ষমতার দম্ভ ব্যক্তিগত লোভ-লালসার কোনো সুযোগ নেই। এ অগণিত জনগণই ক্ষমতার উৎস, ক্ষমতার মালিক। এ জনগণের হৃদয় জয় করেই, সম্মান অর্জন করেই জননেতা হতে হয়। ‘জননেতা’ চারপাশ ঘিরে থাকা চাটুকার নয়, অগণিত জনগণ মনের গভীর থেকে উচ্চারিত হয়। হে ক্ষমতাবান সরকারি কর্মকর্তাগণ! জনগণের টাকায় দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার পর এ চেয়ার সাময়িক সময়ের জন্য দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতার দম্ভে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের ফাইল আমলাতন্ত্রের জটিলতায় আটকে রাখার জন্য নয়। জনগণের সেবক হিসেবে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে জনগণের করের টাকায় বেতন-ভাতা, গাড়ি-বাড়ি, বিদেশ ভ্রমণের বিলাসী জীবন যাপনের বিনিময়ে মানুষকে উপেক্ষা করা নয়। অবজ্ঞা করা নয়, দরজার বাইরে বসিয়ে রাখা নয়। সংবিধান অনুযায়ী অর্পিত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে সরকারের গণকল্যাণমুখী সব কর্মকান্ড দ্রুত সম্পাদন ও বাস্তবায়নের জন্য এ ক্ষমতা। ক্ষমতা গর্বিত অভিষেকের কিছু নেই। হে ক্ষমতাবান আমলাগণ! জনগণের দিকে তাকাও। মাথা নত করে দেখ ক্ষমতার মালিকরা দেশের জন্য কতটা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। এ দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে একজন শিল্পপতি থেকে শ্রমিক পর্যন্ত দিবা-রাত্রী কাজ করছে। একেকটি শিল্পকারখানায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার কারণে সরকারের চেয়ে বেসরকারি খাতে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগই হয়নি, সেখানে দেশের মেধাবী সন্তানরা তাদের সর্বোচ্চ শ্রম দিচ্ছে। সেসব প্রতিষ্ঠান যত শক্তিশালী হবে যত বড় হবে ততই দেশের অর্থনীতিই নয়, মানুষের ভাগ্যের দুয়ারও প্রশস্ত হবে। হে ক্ষমতাবান মন্ত্রীগণ! বিশ্বের যে কোনো জায়গা থেকে বিশ্বসেরা মন্ত্রীর খেতাব নিয়ে এলে মানুষ আনন্দিত হয়, গর্বিত হয়। কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরে না এলে সেই আনন্দ ধূসর হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ব্যাংক খাতে ঋণের সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে কার্যকরের সিদ্ধান্ত অবশেষে হলেও এখনো ব্যাংক লুটেরাদের আইনের আওতায় আনা যায়নি। আইন শুধু গরিবের জন্য নয়, আইনের খড়্গ শুধু সরকারি দলের দুর্বল কর্মী আর সরকারবিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর প্রয়োগের জন্য নয়; আইনের শাস্তি সব অপরাধীর জন্য সমান। দেশের অর্থনীতিকে হাতে গোনা কয়েকজনের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমাজের বৈষম্য কমিয়ে আনতে মুক্তিযুদ্ধের রক্তে লেখা সংবিধান উপহার দেননি। বিশ্বমোড়লদের সামনে দাঁড়িয়ে দুর্ধর্ষ সাহস নিয়ে বলেননি তিনি শোষিতের পক্ষে। দেশের অর্থনীতিকে লুটপাট করে অবৈধ পথে বিপুল অর্থ-সম্পদ গড়ে যারা বিদেশে পাচার করেছে তাদের আইনের রশিতে এখনো বাঁধা যায়নি। এখনো টানা ১০ বছর ধরে শেয়ারবাজার লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ দূরে থাক, লাখ লাখ রিক্ত-নিঃস্ব বিনিয়োগকারীর ক্রন্দন ক্ষমতাবানদের হৃদয় স্পর্শ করেনি। শেয়ারবাজারে রিক্ত-নিঃস্ব বিনিয়োগকারীরা স্তব্ধ হয়ে গেছে লোকসান গুনতে গুনতে। প্রতিদিন বাজার পড়তে পড়তে মূলধন থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা কারসাজি করে লুটে নিয়ে শেয়ারবাজারে কবরের নিস্তব্ধতা এনে দেওয়া হয়েছে। বিএসইসি থেকে ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের অথর্ব নেতৃত্ব চরম ব্যর্থ। ব্রোকার হাউসের মালিকদের যে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিজেদের নিঃস্ব করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার মুখে সেখানে কোনো আশ্বাসের বাণীও নেই। হে দায়িত্বশীল ক্ষমতাবানগণ! দেশের অর্থনীতির প্রতিফলন ঘটে পুঁজিবাজারে। যাদের অডিট রিপোর্ট পর্যন্ত নেই তাদের বাজে কোম্পানির শেয়ার বাজারে আনল কারা? সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের দায়িত্বটা কী? ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ও ব্রোকার অ্যাসোসিয়েশনের তথাকথিত নেতার আসনে বসা নির্লজ্জ-বেহায়া নেতৃত্ব করছেটা কী? হে ক্ষমতাবানগণ! মাথা নত করে জনগণের দিকে তাকাও। জনগণ ক্ষমতার মালিক, জনগণের কল্যাণে তোমাদের সব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দায়িত্বে বসানো হয়েছে। মুজিবকন্যার উন্নয়নের মহাকর্মযজ্ঞে দুর্নীতির যে মহোৎসব চলছে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সে বীভৎস চিত্রই উঠে আসছে না অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের লোভী ব্যর্থ প্রশাসনের দেউলিয়াত্বও দৃশ্যমান হয়েছে। দেশের এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যেটি নড়বড়ে দুর্বল হয়ে পড়েনি। রাজনীতিবিদ ও তাদের কর্মীদের চেয়েও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আমলা, চিকিৎসক, প্রকৌশলীদের মধ্যে দলবাজির নজিরবিহীন দৌরাত্ম্য প্রতিযোগিতামূলকভাবে বেড়েছে। গণমাধ্যম থেকে সিভিল সোসাইটি, লেখক-কবি-সাহিত্যিকরাও নানা মতলবে দলকানা-দলদাসের মেরুদন্ডহীন প্রতিযোগিতার ভিড়ে হারিয়ে গেছেন। জনগণের প্রতি দায়দায়িত্ব ভুলে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে অন্ধের জীবন যাপন করছেন। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার হয়ে গেছেন বিগত এগার বছরের সব পেশাজীবী। বেগম খালেদা জিয়ার চেয়েও বড় বিএনপি হয়ে গেছেন এ পথের আরেক পক্ষ। ক্ষমতার মালিক মানুষের দিকে তাকানোর, মানুষের মনের কথা শোনার সময় কারও নেই। অনেক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের নিশ্চিন্ত আরাম-আয়েশের জীবনযাপনের সুখের ঠিকানা হলেও সেসব প্রতিষ্ঠান সংবিধান ও আইন-বিধি-বিধানের ওপর জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দলবাজির ঊর্ধ্বে শক্তিশালী করার, মানুষের আস্থায় নেওয়ার কোনো চেষ্টা নেই। এভাবে ক্ষমতার মালিক জনগণের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। একজন ছাত্রীর ধর্ষণ ঘটনা নিয়ে যে প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেখান থেকে বুঝতে হবে যে কোনো অন্যায় বা উদাসীনতায় তারুণ্য যে কোনো সময় দ্রোহ করে বসতে পারে। ক্ষমতা শপথ ভঙ্গ করলে মানুষের আস্থার শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়ে যায়। ক্ষমতা শপথ, সংবিধান আইন ভাঙলে জনগণও দ্রোহ করে সব ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এটাই ইতিহাস। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতামূলক উৎসবমুখর পরিবেশে হোক- এমনটি সবাই চায়। মানুষ নির্বিঘ্নে ভোটদান করুক। বিজয়ীরা এসে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন মশা ও যানজটমুক্ত নগরী নগরবাসীকে উপহার দিন, এটাই মানুষের প্রত্যাশা। নির্বাচন কমিশনের প্রতি যত না আশা তার চেয়ে বেশি আশা সরকার ও প্রশাসনের প্রতি। মানুষের এ আশাটুকু মুজিববর্ষের সূচনায় পূরণ হোক। মুজিববর্ষের শুরুতে ঢাকা নগরীর এ ব্যালটযুদ্ধে সরকারি দল হারলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কিছু হবে না। দুই বর্ষীয়ান নেতা আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদকে দুই দিকের দায়িত্ব দিয়েছে সরকারি দল। এ ভোট অবাধ-নিরপেক্ষ উৎসবের ভোট হোক। দমন-পীড়ন-আতঙ্কের নয়। ভোটারবিহীন নয়। হে ক্ষমতাবানরা! মাথা নত করে ক্ষমতার মালিক জনগণের দিকে তাকাও। মনে কর দেশের প্রতিটি মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে বলছে মাথা নত করে আমার দিকে তাকাও, আমিই জনগণ। আমিই ক্ষমতার মালিক। জনগণ হাসতে হাসতে কর দিচ্ছে। জনগণ অবলীলায় ভ্যাট দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা উজাড় করে উন্নয়ন দিচ্ছেন। সেই উন্নয়নের বরাদ্দ লুটপাটের দুঃসাহস যারা করছে তাদের পাকড়াও কর। মুজিববর্ষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষকে জাগাও। ক্ষমতাবানদের সতর্ক কর। দেশজুড়ে মেগা প্রকল্প সড়ক-মহাসড়ক-সেতু-কালভার্ট, বড় বড় ভবন, হাসপাতাল উন্নয়নের মহাকর্মযজ্ঞ চলছে। শিক্ষাঙ্গনে একের পর এক ভবন হচ্ছে। হাসপাতালগুলোয় অত্যাধুনিক মেশিন যাচ্ছে। হে ক্ষমতাবান মন্ত্রী -আমলাগণ! ঠিকাদারদের সঙ্গে এসব ভবন ও মেশিনে কারা লাভবান হচ্ছেন জানি না কিন্তু হাসপাতালে যখন চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান থাকেন না, শিক্ষাঙ্গনে যখন চরম শিক্ষক সংকট তখন এসব ভবন আর অত্যাধুনিক মেশিন জনগণের কল্যাণে আসে না। সুনামগঞ্জ জেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জুবিলি হাইস্কুল ১৩৬ বছরে পুরনো। সেখানে প্রধান শিক্ষকসহ অনেক শিক্ষক সংকট রয়েছে। সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চবিদ্যালয়েও প্রধান শিক্ষকসহ অনেক শিক্ষক নেই। ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালে ৬২ জন চিকিৎসকের জায়গায় মাত্র ১২ জন চিকিৎসক আছেন। আর নার্সের অপ্রতুলতার মধ্যে ২২ জনকে সেদিন বদলি করে দেওয়া হয়। টেকনিশিয়ান অপ্রতুল। হে ক্ষমতাবানরা! দলবাজিতে ব্যক্তিস্বার্থে নানা মতলবে ডুবে থাকলেই হবে না, মানুষের কল্যাণে উন্নয়ন মনিটরিং ও জনগণের সেবা ঠিকমতো যাচ্ছে কিনা সেই প্রশ্নে ঘুম ভাঙতে হবে। হে ক্ষমতাবানরা! তোমরা চিরস্থায়ী নও। ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী হয় না। আজকের ক্ষমতা কালকেই তাসের ঘরের মতো ভেসে যায়। থাকে রাষ্ট্র ও জনগণ। অতএব জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর এ শুভক্ষণে তাঁর মহান নির্লোভ আত্মত্যাগের গভীর দেশপ্রেম ও জনগণের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা জাগ্রত করে ইবাদতের মতো সততার সঙ্গে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের জায়গা থেকে সব দম্ভের বিষ ঝেড়ে ফেলে মানুষের দিকে তাকাও। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মানুষের কল্যাণে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে নিয়ে কাজ করার বিকল্প নেই। এ জনপদের প্রতিটি জনগণ তার গণতান্ত্রিক অধিকার যেমন ভোগ করতে চায়, তেমনি ধর্মবর্ণনির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উন্নত আধুনিক বাংলাদেশ দেখতে চায়। এখানে মানুষ ন্যায়বিচার চায়। ক্ষমতার দম্ভে সুবিধাবাদী মতলববাজ দুর্নীতিবাজ খুনি ও ধর্ষকদের উল্লাস দেখতে চায় না। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অস্ত্রের জোরে খুনিদের বিভীষিকাময় উল্লাস দেখেছে বাংলাদেশ। একাত্তরের হানাদার বাহিনীর দোসরদের গাড়িতে শহীদের রক্তে আঁকা পতাকা শোভিত ক্ষমতার বিকৃত দম্ভ দেখেছে রক্তে ভেজা দেশ। সব সময় দুর্নীতিবাজদের উল্লাস দেখতে হয়েছে। দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাবাদীদের এ উল্লাস বড় বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে আজ। দুর্নীতি ও সুবিধাবাদী এ দানবশক্তিকে রুখে দিয়ে মানুষের কল্যাণের গণতান্ত্রিক ও সুশাসনের রাজনীতির সময় এখন দরজায় কড়া নাড়ছে। হে ক্ষমতাবানগণ! মাথা নত করে জনগণের হৃদয়ের এই আকুতি শোনো। বল, মহান মুজিবের ডাকে একদিন ত্যাগের মন নিয়ে দেশের জন্য ঝাঁপ দিয়েছিলাম। আজ ঘুষ-দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদমুক্ত স্বপ্নের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে সেই ঐক্যের মোহনায় মিলিত হই। ক্ষমতার মালিক জনগণের দিকে মাথা নত করে তাকাই। জনগণই শেষ কথা। সকল ক্ষমতার উৎস। সূত্র:বাংলাদেশ প্রতিদিন। লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।