রবিবার, ৩১শে মে, ২০২০ ইং

করোনা ভাইরাস সাংবাদিক ও তার মানবিকতা

এস কে দোয়েলঃ কঠিন এক মহাযুদ্ধে লড়ছি সবাই। এ যুদ্ধ নিজেদের বাঁচানোর। অন্যদের বাঁচানোর। এমন এক লড়াই, এ লড়াইয়ের শত্রু কোন মানুষ নয়; অনুজীবের চেয়েও অনুজীব। যার নাম ভয়ংকর করোনা ভাইরাস বা কোভিড নাইনটিন। যেখানে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধে সমরাস্ত্র দিয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে অদৃশ্য এক অণু জীবাণু টালমাতাল করে দিল পুরো বিশ্বকে। গোটা জাতিকে ঘরবন্দী করে ফেলেছে। ২১০টি দেশ আক্রমণ করে প্রাণ কাড়লো প্রায় তিন লাখের কাছাকাছি মানুষের। আক্রান্তের সংখ্যা পৌছতে শুরু করেছে ৪০ লাখের দিকে। সংক্রামক ব্যাধির কারণে সামাজিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তার সাথে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে শারিরীক দূরত্বের সাথে নি:সঙ্গতাও তৈরি হয়েছে। মৃত্যুর ভয় তাঁড়িয়ে বেড়াচ্ছে। মৃত্যুর আশঙ্কা জেনেও এই কঠিন সময়ে করোনা মোকাবেলায় ডাক্তার-নার্স, পুলিশের পাশাপাশি সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছে গণমাধ্যমকর্মীরা। সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি কেউ কেউ নিজের অর্জিত কিছু অর্থ, পরিবার থেকে খাদ্য নিয়ে পৌছে দিচ্ছে অনাহারী মানুষ, অভুক্ত প্রাণীদের মুখে। কারণ, একজন সাংবাদিক শুধু রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের সৈনিকই নয়, সে একাধারে মানবাধিকার কর্মীও বটে। করোনা এ কঠিন পরিস্থিতিতে অসহায় মানুষদের পাশে খাদ্য সামগ্রী নিয়ে হাজির হতে দেখা গেছে সাংবাদিকদেরও। তেমনি এক প্রবীণ সাংবাদিক পঞ্চগড়ের শহীদুল ইসলাম শহীদ। তিনি দৈনিক দেশ রূপান্তর ও ডেইলি অবজারভার পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঘরহীন ভবঘুরে মানুষ। যাদেরকে আমরা মানসিক ভারসাম্যহীন (পাগল) হিসেবে চিনি। টানা লকডাউনে যখন সব কিছু স্থবির। বন্ধ দোকানপাট, হোটেল-রেস্টোরা। এতে করে খাদ্য সংকটে পড়ে এসব ভবঘুরে অসহায় মানুষগুলো। লকডাউনের শুরু থেকেই খাদ্য সংকটে পড়া মুখে খাবার পৌছে দিচ্ছেন প্রবীণ সাংবাদিক শহীদ। এ কাজটি করছেন তিনি প্রায় ৪০ দিন ধরে। ঘরে অসুস্থ্য সহধর্মিনী। পেশাগত ভাবেও নেমে এসেছে অর্থ সংকট। তারপরেও মানবিকতার টানে মানসিক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক ছিন্নমূল ভবঘুরে মানুষদের একবেলা খাবার পৌছে দিচ্ছেন। প্রতিদিন সকালে স্ত্রী-সন্তানদের সহযোগিতায় রান্না করা খাবার প্যাকেট করে বাসা থেকে প্রেসক্লাব, সেখান থেকে মিলগেট সেখান থেকে রেলস্টেশন সেখান থেকে জালাসী সেখান থেকে ব্যারিস্টার বাজার ঘুরে ১৫-২০ জন মানসিক ভারসাম্যহীনদের মুখে তুলে দিচ্ছেন এ খাবার। খাবারের তালিকায় থাকে কখনো মাংস, ডিম। পঞ্চগড়ের আরেক সংবাদকর্মী সরকার হায়দার। সাংবাদিকতায় পেশায় দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ প্রতিদিন ও নিউজ২৪ টেলিভিশনের পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি হিসেবে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিজের হাতে গড়ে তোলা নাট্যসংগঠন ‘ভূমিজ’র সহযোদ্ধাদের নিয়ে করোনায় উদ্ভট পরস্থিতিতে চলমান টানা লকডাউনে ঘরবন্ধী খাদ্য সংকটে থাকা অসহায় মানুষদের ঘরে উপহার হিসেবে পৌছে দিয়েছেন খাদ্য সামগ্রী। এরকমটি দেখা যায় বাংলা টিভির তরুণ সংবাদকর্মী ডিজার হোসেন বাদশা’র কাজে। প্রায় শতাধিক পরিবারে তিনিও পৌছে দিয়েছেন খাদ্য সামগ্রী। পেশাগতভাবে করোনা এ দূর্যোগ পরিস্থিতিতে টানা লকডাউনে তেঁতুলিয়ার সহযোদ্ধা আহসান হাবীবকে নিয়ে এক মাসের বেশি সময় ধরে খাদ্য সংকটে থাকা অসহায় মানুষদের পাশাপাশি চারপাশে অভুক্ত প্রাণীদের (কুকুর-বিড়াল) মুখে খাবার তুলে দিতে চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরাও। যা অব্যাহত রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতি পর্যন্ত চলবে। এ কাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সহযোগিতা করছে ইয়াংস্টার কমিউনিটি বাংলাদেশ’র সহযোদ্ধারা। সারাদেশে বেশ কটি জেলায় আমরা কাজটি করতে পেরেছি। প্রচেষ্টা চলছে। সেদিক থেকে তেঁতুলিয়া ইয়াংস্টার কমিউনিটির দুই সংবাদকর্মী প্রতিদিন ৫০-৬০টি কুকুর-বিড়ালের মুখে কখনো রান্না করা খাবার, কখনো শুকনো (পাউরুটি, কেক) তুলে দেয়া হচ্ছে। মানুষের পাশে মানুষ, প্রাণীর পাশেও মানুষ আর ফুড ফর হাঙ্গরী এনিম্যালস্ধসঢ়; প্রতিপাদ্য নিয়েই কাজটি শুরু করেছিলাম আমরা। প্রাণীরা আমাদের সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করে, ওদের বাঁচিয়ে রাখা আমাদের কর্তব্য’। এবার আসি ক্ষুদ্র সংবাদকর্মী তানিয়াকে নিয়ে। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার মনেও জেগে উঠেছে মানবিকতার টান। মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা, টিফিনের টাকা আর দাদীর দেয়া চার আনা ওজনের এক জোড়া কানের দুল বিক্রি করা অর্থ দিয়ে ইচ্ছে ছিল ঈদ মাকের্ট করার। কিন্তু বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনা দুর্যোগে যখন অসহায় হয়ে উঠেছে মানুষ। সেই অসহায়, এতিম আর ছিন্নমুল রোজাদার তাদের কাছে খাবার পৌছে দিতে অস্থির হয়ে উঠেছে ক্ষুদ্র এ সংবাদকর্মীর কোমল মন। রবিবার তার সঞ্চিত অর্থে শহরের এতিম ও ছিন্নমুল রোজাদারদের ভুনা খিচুরীর সাথে মাংস দিয়ে খাবার আর অবশিষ্ট টাকা তাদের মাঝে বিতরন করার মানবিকতা আমাদের সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। ক্ষুদ্র এ সংবাদকর্মী তানিয়া পঞ্চম শ্রেণি থেকে সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি করে প্রায় শতাধিক সংবাদমাধ্যমে লেখা প্রকাশ হয়েছে তার। তাঁর বিভিন্ন রিপোর্ট প্রায় ৩০টি সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে বলে জানিয়েছে তানিয়া। ক্ষুধে এ সংবাদকর্মী তানিয়া অত্যন্ত মেধাবী। যে কীনা পিএসসি পি এস সি (এ+), জে এস সি (এ+) ও এস এস সি (এ+) অর্জন করেছে। মাদারীপুরের ছিলারচর থানায় বাড়ি। বর্তমানে রাজধানীর তুরাগের ধউর এলাকার মা-বাবার সাথে থেকে টঙ্গী সরকারী কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে সে। পেশাগতভাবে বাবা ইলিয়াছ মোল্লা তিনিও সাংবাদিকতার সাথে জড়িত। মা রানী বেগম গৃহিনী হয়েই মেয়ের এ মানবিকতার কর্মে উৎসাহিত করে যাচ্ছেন। সাংবাদিকতার পেশায় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংবাদকর্মীরা যে মানবিকতার পরিচয় দিচ্ছে, সম্মুখ যোদ্ধা হয়ে দায়িত্ব পালন করছে। বিপদ সন্নিকটে জেনেও নিজের জীবন বাজি রেখে সংবাদ, তথ্য, উপাত্ত, চিত্র সংগ্রহ করে সংবাদমাধ্যমে কাজের পাশাপাশি মানুষের পাশে, অভুক্ত প্রাণীদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার এরকম উদাহরণ অনুপ্রাণিত করে। এ চিত্র হয়তো দেশের অনেক জায়গাতেই রয়েছে। সেখানকার সংবাদকর্মীরা মানবিকতার পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের নাম জানা নেই বলেই এ অধ্যায়ে তুলে ধরতে পারলাম না। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, সংবাদকর্মীরা আজ মধ্যবিত্তদের পর্যায়। চক্ষুলজ্জায় কারো কাছে না পারছেন কিছু চাইতে, না পারছেন পরিবারের দৈন্যতা প্রকাশ করতে। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের প্রথম শ্রেণির সৈনিক হয়েও কঠিন এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দায়িত্ব পালন করলেও তাদের নিয়ে ভাবা হচ্ছে না। ইতিমধ্যে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃত্যু ছাড়িয়েছে ২’শ’র উপরে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত-মৃত্যুর সংখ্যা। করোনা প্রতিরোধে মাঠে কাজ করতে গিয়ে চিকিৎসক ও পুলিশের পাশাপাশি আক্রান্ত হচ্ছেন সাংবাদিকেরাও। এখন পর্যন্ত ৩১টি গণমাধ্যমের অন্তত ৫৩ জন কর্মীর করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তার মধ্যে দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার সিটি এডিটর ও প্রধান প্রতিবেদক হুমায়ুন কবীর খোকন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তারপর একই পত্রিকার সহ-সম্পাদক সাংবাদিক মাহমুদুল হাকিম অপু ও দৈনিক ভোরের কাগজের ক্রাইম রিপোর্টার আসলাম রহমান করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্ভট পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভিন্ন খাতে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রনোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। কৃষকদের উৎপাদনের জন্য প্রনোদনা প্যাকেজ। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত যেসব ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য দিয়েছেন সম্মানী পুরস্কার ঘোষণা। দায়িত্ব পালনকালে এদের কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ও বীমার ব্যবস্থা করা হবে। সেই সাথে পদমর্যাদা অনুযায়ী ৫-১০ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্যবীমা করা হবে। মৃত্যুর ঝুঁকি আছে বা মৃত্যুবরণ করলে তাদের জন্য এই বীমা ৫ গুণ বৃদ্ধি করে দেয়ার ঘোষনা দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু সাংবাদিকদের জন্য তো এখন পর্যন্ত ঘোষনা নেই, নাই কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নাই কোন প্রনোদনা আর নাই কোন এসব সম্মুখ যোদ্ধাদের পরিবারের খোঁজখবর রাখার মতো কেউ। # ০৯/০৫/২০২০ এস কে দোয়েল সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সংগঠক তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়।