১৭, অক্টোবর, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ১৭ সফর ১৪৪১

আইএস যোদ্ধাদের সন্তানদের ভাগ্যে কি রয়েছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বে ত্রাস সৃষ্টিকারী জঙ্গি সংগঠন আইএস দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়েছে। হারাতে বসেছে তাদের সব নিয়ন্ত্রিত এলাকা। বিভিন্ন বাহিনীর কাছে আটক রয়েছে হাজার হাজার আইএস যোদ্ধা ও তাদের পরিবার। অনেকের মৃত্যুর পর তাদের সন্তানেরা সিরিয়ায় আটকে আছে। সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর শক্ত ঘাটিগুলো পতনের পর তাদের যোদ্ধাদের অনেকের পরিবারের আশ্রয় মিলেছে শিবিরে। এই শিশুদের নিজের দেশে ফিরে যাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা। বিবিসি রিয়ালিটি চেক তিনটি অনাথ শিশুর ঘটনা দেখার চেষ্টা করেছে যাদের বাবা-মা যুক্তরাজ্য থেকে সিরিয়াতে এসে ইসলামিক স্টেট গ্রুপে যোগ দেন। তারা যুদ্ধে নিহত হওয়ার পর সিরিয়াতে আটকে পরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এখন কী হবে? উত্তর সিরিয়ায় শিবিরে থাকতেন আমিরা, হেবা ও হামজা। বিবিসির একটি রিপোর্টে তাদের দেখানো হয়েছিল। জাতিসংঘ সম্প্রতি তাদের উদ্ধার করে রাকা শহরে নিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের প্রত্যাবাসনে তৈরি হয়েছে জটিলতা। সাধারণত বিদেশি নাগরিকেরা নিজ দেশের দূতাবাসের সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখে। উত্তর সিরিয়ার যে অংশে ইসলামিক স্টেট যোদ্ধাদের পরিবারের জন্য তৈরি শিবিরটি রয়েছে, সেই এলাকা এখন কুর্দি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এই বাহিনীর প্রধান বহুদিন যাবত ইউরোপিয়ান দেশগুলোকে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। আন্তর্জাতিক কমিটি অফ দ্যা রেডক্রস বা আইসিআরসি এই ব্যাপারে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তারা বিভিন্ন ক্যাম্পে থাকা বিদেশিদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে সরাসরি সেই দেশগুলোর দূতাবাস বা কনসুলারে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু সেসব দূতাবাস থেকে তেমন কোন সাড়া মেলেনি। আর একটি সমস্যা হল বহু দেশ সিরিয়াতে তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছে। আইসিআরসির প্রধান পিটার মরার এ বছরের শুরুতে বলেছিলেন, ‘একটি খুব জটিল পরিস্থিতির দিকে আমরা তাকিয়ে আছি। জরুরী মানবিক সহায়তা দেয়া ছাড়া কেউই কোন প্রক্রিয়া বা অবকাঠামো তৈরি করে বিষয়টি সামাল দিতে আগ্রহী নয়।’ কোন কোন দেশ নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে বলেছে, বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য এই মুহূর্তে তাদের কর্মকর্তাদের সিরিয়াতে পাঠানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। সাংবাদিকরা সিরিয়ার সেই শিবিরে গেছেন। যুক্তরাজ্যের একটি পালার্মেন্ট সদস্যদের দলও সেখানে গেছেন। সেই দলের একজন ছিলেন কনজারভেটিভ এমপি ক্রিসপিন ব্লান্ট। তিনি বলেছেন, সিরিয়া থেকে ব্রিটিশ নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এমন একটি বোঝা যা আমাদের বহন করতে হবে এবং শিশুদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। অস্ট্রেলিয়া অবশ্য সম্প্রতি বলেছে তারা শিশুদের উদ্ধার করার জন্য কোন ঝুঁকি নিয়ে তাদের কর্মকর্তাদের সেখানে পাঠাবে না। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন্ডা রেনল্ডস বলেছেন, ‘জায়গাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমরা কোন অস্ট্রেলিয়ানকে সেখানে পাঠিয়ে তার জীবন বিপন্ন করবোনা’। যদি কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত যোগাযোগ করেনও, এই বিষয়ে তাদের পরবর্তী কাজ হবে এসব শিশুদের জাতীয়তা ও অভিভাবকত্ব নিশ্চিত করা। কিন্তু সেটি খুবই জটিল একটি ব্যাপার। কারণ শিশুটির মা-বাবার পরিচয় নির্ধারণ করার কোন কাগজপত্র হয়ত আর নেই। শিশুটি অনাথ হলে তার বৈধ অভিভাবকের পরিচয় নিশ্চিত করা মুশকিল হতে পারে। এই মুহূর্তে ডিএনএ পরীক্ষা করে অভিভাবকত্ব নিশ্চিত করার কোন ব্যবস্থাপনা তাদের আশপাশে নেই। যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, এসব কারণে শিশুদের জাতীয়তা নির্ধারণ করার খুবই কঠিন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতর বলেছে, ‘নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে আমরা সকল ধরনের প্রমাণ যাচাই করি। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি সহজ নয়’। জুলাই মাসে কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের এক জরীপ বলছে, এখনো পর্যন্ত মাত্র চারটি শিশু যুক্তরাজ্যে ফিরেছে। তবে তারা বলেছে সংখ্যাটি নির্ভুল নাও হতে পারে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ পার্লামেন্টে বলেছেন, যুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়া শিশুদের জন্য তার সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু তার সাথে আরও যোগ করে বলেন, ‘আমরা যদি এসব শিশুদের উদ্ধারের জন্য আরও কিছু করতে চাই, আমাদের ভাবতে হবে ভবিষ্যতে তা যুক্তরাজ্যের শিশুদের কী ধরনের ঝুঁকিতে ফেলবে’। সম্প্রতি আলোচনায় আসা শামিমা বেগমের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকার তার নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করলেও তার সন্তান ব্রিটিশ নাগরিক হতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিলো। শামিমা বেগমের তিন সপ্তাহ বয়সের শিশুটি অবশ্য সিরিয়ায় শরণার্থী শিবিরেই মারা যায়। বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই বেশ কিছু শিশুকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। যেমন রাশিয়া প্রায় ১৪৫ থেকে ২০০ মতো শিশুকে বিমানে করে ফিরিয়ে এনেছে। বেশ কয়েকটি মধ্য এশিয়ার দেশও অনেক শিশুকে প্রত্যাবাসন করেছে। মে মাসে কাজাখস্থান সিরিয়ার শিবির থেকে ২৩০ জন কাজাখ নাগরিককে ফিরিয়ে এনেছে যাদের বেশিরভাগই শিশু। সম্প্রতি ডিএনএ পরীক্ষার পর অস্ট্রিয়া দুটি শিশুকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। তারা ফেরার পর কার হেফাজতে থাকবে সে নিয়ে আদালত একটি নির্দেশনা দিয়েছে। জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইডেন এবং নরওয়ে একই ধরনের কাজ করেছে। এতে শিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকা কুর্দি বাহিনী, ইরাকি সরকার, রেডক্রস এবং অন্য কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে নানা ধরনের সমন্বয় দরকার হয়েছে।