১৬, অক্টোবর, ২০১৯, বুধবার | | ১৬ সফর ১৪৪১

৩৬০০ বছর আগেই সার্জারি বইটি লেখা হয়েছিল

‘দ্য এডুইন স্মিথ প্যাপাইরাস’ হচ্ছে প্রাচীন মিশরের একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত মূল্যবান গ্রন্থ। গ্রন্থটির নামকরণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্নতাত্ত্বিক উপকরণ সংগ্রাহক এডুইন স্মিথের নামানুসারে। স্মিথ মিশরের এক দোকানদারের কাছ থেকে প্যাপাইরাস গ্রন্থটি ক্রয় করেছিলেন। প্যাপাইরাস পৃথিবীর প্রাচীনতম চিকিৎসা সংক্রান্ত গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখযোগ্য। যাতে মিশরীয়দের দ্বারা প্রাপ্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। স্মিথ ১৮৬২ সালে, মিশরের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর লুক্সোর থেকে প্যাপাইরাসের অর্ধেক অংশ কোনো এক ব্যক্তির কাছ থেকে ক্রয় করেছিলেন। এর দু’মাস পর ঐ একই ব্যক্তি স্মিথের কাছে গ্রন্থটির বাকি অংশও বিক্রি করেন। গ্রন্থটি ক্রয় করার পরপরই স্মিথ সেটি অনুবাদের জন্য রাত-দিন পরিশ্রম করতে থাকেন। কঠোর পরিশ্রমের দ্বারাও স্মিথ প্যাপাইরাস গ্রন্থটির কোনোকিছুই অনুবাদ করতে পারেননি। কয়েক দশক অতিবাহিত হওয়ার পর, ১৯০৬ সালে স্মিথ মারা যান। তার মৃত্যুর পর ‘নিউইয়র্ক ঐতিহাসিক সমিতি’তে তার মেয়ে বইটি দান করেন। ১৯২০ সালে অপর এক যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্নতাত্ত্বিক উপকরণ সংগ্রাহক জেমস হেনরি ব্রেস্টেডকে বইটি অধ্যয়নের জন্য দেওয়া হয়। তিনি বইটির অনুবাদ করতে সক্ষম হন এবং অনুবাদের দ্বারা দুটি ভলিউম প্রকাশ করেন। লাল-কালো কালিতে লেখা গ্রন্থটি খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ সালে রচিত হয়েছিল। তবে গ্রন্থটির কিছু কিছু তথ্য থেকে ধারণা করা হয় সেটি ৩০০০-২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে লেখা হয়েছিল। ব্রেস্টেড যখন গ্রন্থটি অনুবাদ করেন তখন তাতে অনেক ভুল থেকে যায় বলে মনে করা হয়। অবশ্য এই ভুল হওয়ার কারণও ছিল। কারণ গ্রন্থটির উভয়প্রান্তের লেখার অংশ কাটা ছিল বা লেখা দেখা যেত না। তবে এই গ্রন্থটিই শল্যচিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে পুরনো গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর গ্রন্থটি মিশরীয়দের চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞানের পরিচয় বহন করে। এডুইন স্মিথের সংগৃহিত প্যাপাইরাস গ্রন্থটি সামরিক বাহিনীর চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হতো বলে ধারণা করা হয়। কারণ গ্রন্থটিতে প্রাপ্ত ৪৮টি চিকিৎসার (রোগ, ঘটনা, রোগ ইতিহাস ইত্যাদি) বিষয়বস্তু ক্ষত ও আঘাত, ক্ষত, হাড় ভাঙ্গা, ইনজুরি, হাড়ের অথবা শরীরের কোনো অঙ্গের স্থানচ্যুতি, টিউমার ইত্যাদি নিয়ে আলোচিত ছিল। গ্রন্থটি থেকে মিশরীয়দের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কেও অনেক তথ্য জানা যায়। তারা একজন রোগীর কি কি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন সেগুলোর বর্ণনাও গ্রন্থটিতে দেওয়া আছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসা কি হবে বা কি ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োগ করা হবে সেগুলো জানা যায়। পরিশেষে, গ্রন্থটিতে সেলাই ও ব্যান্ডেজের মাধ্যমে কীভাবে ক্ষতের চিকিৎসা করা হতো, স্পিন্ট দিয়ে ভাঙ্গা হাড় জোড়া লাগানোর উপায়, প্রদাহ প্রতিরোধ ও সাড়াতে মধুর ব্যবহার, জীবাণুনাশক ও এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার ইত্যাদিও উল্লেখ করা আছে। চিকিৎসার জন্য করোটি বা মাথার খুলিতে যে সেলাই করা যাবে তা বর্তমান চিকিৎসাবিদরা জেনেছেন প্যাপাইরাস থেকে। মিশরীয়রা জানতেন মস্তিষ্কের কোনো এক অংশের ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট অংশ যে কাজগুলো করতো তা বিকল হয়ে যায়। এমন অবস্থাকে বলা হয় প্যারালাইসিস। প্যাপাইরাস মিশরীয়দেরকে মানুষের অঙ্গসংস্থানবিদ্যা বিষয়ক অনেক সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান দিয়েছে। গ্রন্থটি হৃদপিণ্ড  ও তার নালী, কলিজা, প্লিহা, কিডনি, হাইপোথ্যালামাস, জরায়ু, মূত্রথলী ইত্যাদি সম্পর্কেও ধারণা দিয়েছে। তবে এসবের যথাযথ কাজ কি তা গ্রন্থটি থেকে বোঝা যায়নি। উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সার্জারি বা শল্যচিকিৎসা বিষয়ে মিশরীয়দের প্রচুর জ্ঞান ছিল। আর সেই জ্ঞানগুলো লিপিবদ্ধ ছিল প্যাপাইরাস নামক গ্রন্থটিতে। যা বর্তমানেও চিকিৎসকদের ভাবিয়ে তুলছে। তথ্যসূত্র : এনসায়েন্ট-অরিজিন ডট নেট, নিউরো সার্জারি ডট অর্গ।